গ্রামের নাম চুনকুড়ি। ঝপঝপিয়া নদীর খেয়া পার হওয়ার পর ওপারে গিয়ে তিন মিনিট হাঁটতে হয়। এ পারকে সবাই পূর্বপাড়া বলেন। অনেক নারকেল গাছের ভিতরে ছোট দুটো ঘর। ওই ঘরের মালিক অনীল কৃষ্ণ মণ্ডল। অনীল বাবুর বড় মেয়ে কুমারী মতি মণ্ডল। ওর বিয়ের দিন। বাড়ির আঙিনাতে হরেক বর্ণের কাগজের পতাকা। সামনে দুটো কলা গাছ পুঁতে বিয়ের গেট বানানো হয়েছে। সাদা কাগজে আলতা দিয়ে লাল অক্ষরে লেখা ‘শুভ বিবাহ’।
মতির বিয়ের লগ্ন ঠিক হয়েছে সন্ধ্যা ৭টায়, লোকসমাগম তখনো হয়নি। তবে গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েদের আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে সেই সকাল থেকেই। গ্রামের লোকেরা জানে, আজ মতির বিয়ে। ছেলেটার দাকোপে মুদির দোকান আছে। মতির বাবা অনীল অনেক আগেই ভেবেছিলেন, আমার মতি নিশ্চয় সুখী হবে।
অনীল বাবুর এ সুখ আর স্বপ্নের পেছনে কাজ করেছে তার তিন বছরের সাধনা আর শ্রম। অনীল বাবু একসময় ভ্যান চালাতেন। সংসারে ছয়জন। মতির লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে ক্লাস সেভেন থেকেই। অভাবের সংসার। অভাবের সংসারে এক টুকরো সুখের স্বপ্ন দেখাল সুশান্ত রায়। সুশান্ত গ্রামের শিক্ষিত ছেলে। দাকোপ উপজেলার বিআরডিবি অফিসের একজন অর্গানাইজার। অনীল বাবুকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন আরডিও সুব্রত কুমার রায়।
গোটা উপজেলার ৩৫টি বিত্তহীন সমবায় সমিতি গড়া ছাড়াও আর্থিক সহায়তা করার সুযোগ দিলেন। আর সেই সুযোগে তিন বছর আগে অনীল বাবু মাত্র ১০টি হাঁস-মুরগি দিয়ে একটি পোলট্রি ফার্ম চালু করলেন তার নিজের বাড়ির আঙিনায়। এমন এক দিন ছিল, অনীল বাবু তার সংসারে দুবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারতেন না। এখন তার সংসারে সুখ এসেছে। এসেছে স্বাচ্ছন্দ্য। এ সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে তার নিজের হাতে গড়া পোলট্রি ফার্মটি। গুনে গুনে দেখাল মুরগির সংখ্যা ২২৫ আর হাঁসের সংখ্যা ১৭৪টি। নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া, উন্নতমানের খাবার সরবরাহ করা, সবটাই সে একাই করেছে। তবে এ ব্যাপারে উপজেলা পশু সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম তাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। অনীল বাবু যখন ভ্যান চালাতেন তখন মতির পড়াশোনা বন্ধ ছিল। সমিতির সদস্য হয়ে একটা খামার করেও তার জীবনের চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে লাগল। মতির স্কুলে যাওয়া শুরু হলো। পাত্রপক্ষ মতিকে দেখতে এসে বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেলে। একজন বলে বসলেন, এই সেই অনীল কৃষ্ণ মণ্ডল। এমন একদিন ছিল, কচুরলতি, বিলের শাক আর নদীর শামুক সিদ্ধ করে ভাত খেত-আর সেই অনীল এখন মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে স্বর্ণের অলংকার মুড়িয়ে। দেখলামও তাই। মতির গলায় সোনার চিকন হার, কানের কানপাশা, নাকে নোলক, পায়ে চাঁদির মল, গায়ে লাল বেনারসি শাড়ি। অনীল বাবু বললেন, আগে জানতাম না, এই সমিতি আর সমিতির সহযোগিতা আমার মেয়ের কপাল খুলে দেবে একদিন। ‘বাকিরা কি স্কুলে যায়?’, এ প্রশ্ন আমার। মুচকি হেসে বললেন, এখন যাচ্ছে সবাই স্কুলে। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার চুনকুড়ি গ্রামের অনীল কৃষ্ণ মণ্ডলের ভাগ্য বদলানোর জন্য দক্ষিণবঙ্গের বিআরডিবির সব কর্মকর্তা বেশ প্রশংসার দাবি রাখেন। কারণ খুলনার ৬টি আর সাতক্ষীরার ৭টি উপজেলায় এখন আরডি/১২ প্রকল্পে এসব অসহায় অবহেলিত মানুষকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা এবং সামাজিক অবকাঠামো পরিবর্তন করা ও বিভিন্ন সমিতির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসূচির আওতায় এনে তাদের ভাগ্য বদলানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক মতির বিয়ে হবে নাকে সোনার নোলক দিয়ে। মন্তব্য করলেন, সাতক্ষীরার বিআরডিবির সেলিনা ওয়ালিউদ্দিন।