সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নানা মত দিচ্ছে। কিছু প্রস্তাবে একমতের পাল্লা ভারী হলেও মৌলিক অনেক বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা বিভেদ। কিছু বিষয়ে দলগুলোর রয়েছে ‘আংশিক মত’। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- যেসব ইস্যুতে সব রাজনৈতিক দলের মতামত এক হবে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর যেসব বিষয়ে একমত নয় বা আংশিক একমত সেসব আমরা আলোচনার টেবিলে নিয়ে যাব। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দলগুলো যেসব মতামত দিচ্ছে আসলে সেগুলো তাদের দলীয় ভাবনা। নির্বাচনের আগে এটা এক ধরনের দলীয় নির্বাচনি ইশতেহার বলে মনে হচ্ছে। তবে সব দল যে সব বিষয়ে একমত হবে তা বাস্তবসম্মত নয়।
১৩ মার্চ ছিল মতামত প্রকাশের শেষ দিন। তবে রাজনৈতিক দলগুলো সময় নেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের পরে দলগুলো তাদের মতামত জানাতে শুরু করে। এ পর্যন্ত ৩৭টি দলের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (এনসিসি)। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৩টি রাজনৈতিক দল মতামত দিয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ও এনসিপি রয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত তাদের মতামত জমা দেয়নি। মতামত নেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে এনসিসি। ঈদের পর এই প্রক্রিয়া আরও গতি পাবে বলে জানানো হয়েছে কমিশনের পক্ষ থেকে।
দলগুলোর দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে এনসিসির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যেসব বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে দ্বিমত দেখা যাবে সেসব নিয়ে আমরা আলোচনার টেবিলে বসব। সেখানে সংস্কারে ঐক্য গড়ার চেষ্টা করা হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার প্রশ্নে যেভাবে সহযোগিতা করছে তা অনেক ইতিবাচক বলে মনে করি। সংস্কার প্রক্রিয়াকে কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। এসব পার্থক্যের কারণেই তো নানা দল। তারা যে ঐকমত্যে আসবে সেটা তো খুব বাস্তবসম্মত ধারণা না। সবাই যদি একমত হয়ে যেত তাহলে তো এত দল থাকার দরকার ছিল না। এনসিসিতে যেসব আলাপ-আলোচনা হচ্ছে তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর অবস্থান বোঝা যাচ্ছে। আমি মনে করি, এটা এক ধরনের নির্বাচন পূর্ববর্তী ইশতেহারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ নির্বাচনি প্রচারনার অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা বলা যেতে পারে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইস্যুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইস্যুর মধ্যে রয়েছে- রাষ্ট্রের নাম ও সংবিধানের মূল নীতিমালা, সরকারের মেয়াদ, জাতীয় সংসদের কাঠামো, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা ও একইসঙ্গে দলীয় প্রধান হতে পারবেন কি না, সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া না দেওয়ার ক্ষমতা, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) উল্লেখযোগ্য। এসব মৌলিক ইস্যু আলোচনার টেবিলে নিয়ে ঐকমত্য করতে চায় এনসিসি।
দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না- এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় বিএনপি তাদের মতামতে জানিয়েছে, কারও প্রধানমন্ত্রিত্ব পরপর তিন মেয়াদ না হওয়ার পক্ষে তারা। অর্থাৎ টানা দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রিত্বের পক্ষে তারা। জবাবদিহির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও কমিশন নিয়োগে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক পরিষদ গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। এ ছাড়া প্রত্যাখ্যান করা অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোট, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে জাতীয় গণভোটের ধারণা, নির্বাচন এলাকার সীমানা নির্ধারণে স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রস্তাব। সেই সঙ্গে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল এনসিসির বিরোধিতা করেছে বিএনপি। অন্যদিকে এনসিপি তাদের প্রস্তাবে বলেছে, ইসি ও এনসিসি থাকলে আলাদা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দরকার নেই। যেসব সুপারিশ সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এ সরকারই সেসব সংস্কার করতে পারবে। যেগুলো সংবিধান সম্পর্কিত সেগুলো গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে হবে। আসন্ন নির্বাচনটি গণপরিষদের মধ্য দিয়ে হওয়া দরকার, এটা এনসিপির আগেরই অবস্থান। এ সংবিধানকে বাতিল করা দরকার-মতামত এনসিপির। ১৬৬টি সুপারিশের মধ্যে ১১৩টি প্রস্তাবের বিষয়ে পুরোপুরি একমত হতে পেরেছে এনসিপি। ২৯টি প্রস্তাবে আংশিক একমত হয়েছে, আর ২২টি প্রস্তাবের বিষয়ে একমত হতে পারেনি দলটি।
অন্যদিকে কমিশনের ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে ১১০টির সঙ্গে একমত ও ৪৮টির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে ১২ দলীয় জোট। আর ৮টি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে বলে জানানো হয়। জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু নির্বাচন কেন্দ্রিক সংস্কার ছাড়া বাকি সংস্কার নির্বাচিত সংসদ দ্বারা বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন, গণভোট, গণপরিষদ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করা হয়েছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সব রাজনৈতিক দল যেসব বিষয়ে একমত হবে, সেসব সংস্কার ও বাস্তবায়ন এবং বাকিগুলো নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন যাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের নাম ও সংবিধানের মূল নীতিমালা অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে মতামত দিয়েছে দলটি। দলটি স্বাধীনতার ঘোষণায় উল্লিখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে যুক্ত করার প্রস্তাব রেখেছে। লিখিত মতামতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি কমিশনের ১৬৬টি প্রস্তাবনার মধ্যে ১২২টিতে একমত, ২১টিতে ভিন্নমত এবং ২৩টিতে আংশিক দ্বিমত পোষণ করেছে। তারা প্রার্থীদের বয়স কমানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। এ ছাড়া বৈষম্য বিলোপে আলাদা কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।