বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে ভারত সরকার মন্তব্য করার আগে ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরণের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে দেখা যায়, এ ব্যাপারটা তাদের স্বীকার করা উচিত। ভারতের পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘ফ্রন্টলাইন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি গত মঙ্গলবার ম্যাগাজিনটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যেমন হিন্দু ও বৌদ্ধরা ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশ। একইভাবে, ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যেমন মুসলমানরা বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই, যখন ভারত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে মন্তব্য করে, তখন তাদের এটা স্বীকার করতে হবে যে, তাদের নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের আচরণের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের ওপরও পড়ে।’ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে তিনি কতটা নিরাপদ বোধ করেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় বলেন, ‘আমি হয়তো এর সেরা উদাহরণ নই। আমি দুবার ভারতে শরণার্থী ছিলাম। প্রথমত ১৯৬০-এর দশকে দাঙ্গার পর ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এবং আবার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। তবে আমার বাবা-মা কখনো বাংলাদেশ ছাড়েননি। আমি ফিরে এসেছি, আমার জন্মভূমিতে বিনিয়োগ করেছি এবং এখানেই আমার জীবন গড়েছি। আমি আমার দেশের জন্য অবদান রাখতে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদ ত্যাগ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার পরিবারের বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমার মা শেখ হাসিনার দলের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং আমার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক নিযুক্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছিলেন। কিন্তু এই ব্যক্তিগত সংযোগগুলো আমার পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে না।’ পরিচয়ের রাজনীতি ভূমিকা পালন করলে বাংলাদেশে অবস্থান করার ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার এবং সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সংখ্যালঘু এবং সমতলভূমির আদিবাসী গোষ্ঠী সুরক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্তর্ভুক্তির এই প্রতিশ্রুতিই জাতি গঠনের মূল কথা।’ সাক্ষাৎকারে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি প্রতিস্থাপনের জন্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, ‘এটি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত একটি প্রস্তাব এবং এই বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অনেক মতামতের মধ্যে একটি।
এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের বিশেষত্ব, যেখানে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ পায় এবং কেউ কেউ আদর্শগত কারণে আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক লাভের কারণে কট্টর অবস্থান গ্রহণ করে।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশের কিছু মানুষ ইতিহাস পুনর্লিখন করতে চায়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেশের জাতীয় নীতি নির্ধারণ করবে।’