ঈদের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজনকে হত্যা, ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে পৃথক তিন ঘটনায় চারজন খুন হয়েছেন। এ ছাড়া মেঘনা নদীতে চাঁদা নিয়ে দ্বন্দ্বে জেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নড়াইলে দুই দিনে তিন খুন এবং হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফে ভাসুরের ছুরিকাঘাতের গৃহবধূ খুন এবং রাজবাড়ীতে প্রবাসীর স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চট্টগ্রাম : ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় চারজন খুন হয়েছেন। রবিবার গভীর রাতে নগরীর বাকলিয়া থানাধীন এক্সেস রোড এলাকায় ব্রাশফায়ারে দুজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- বখতেয়ার হোসেন মানিক ও মো. আবদুল্লাহ। বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার উদ্দিন বলেন, ‘জোড়া খুনের ঘটনায় কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ, তার স্ত্রী তামান্না শারমীনসহ মোট ১৪ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম। রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভ্ইুয়া বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছেন নুরুল ইসলাম বকুল নামে এক ব্যক্তি।
নগরীর আকবর শাহ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘মঙ্গলবার উত্তর কাট্টলীতে জায়গার সীমানাকে কেন্দ্র করে শ্যামল চৌধুরী সঙ্গে ঝগড়া হয় প্রতিবেশীর। এতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। নিহতের পরিবার হত্যার অভিযোগ করলেও তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বরিশাল : হিজলা উপজেলাসংলগ্ন মেঘনা নদীতে পণ্যবাহী নৌযানে চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বে এক জেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ৩০ মার্চ রাতে হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়নের পালপাড়া পিএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পেছনে এ ঘটনা ঘটে বলে ওসি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন। নিহত মো. শরীফ তপাদার (২৪) ধুলখোলা ইউনিয়নের হানিফ তপাদারের ছেলে। ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, জেলে শরীফ কয়েকজনকে নিয়ে নদী থেকে মাছ শিকার করে বিক্রির পর ভাগবাঁটোয়ারা করছিল। মেঘনা নদীতে চলাচলকারী কার্গো, বাল্কহেডসহ বিভিন্ন নৌযান থেকে চাঁদা নিয়েছে ভেবে ৮-১০ জন শরীফকে ধরে নিয়ে যায়। পরে মারধর করে। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ভোরে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ওসি বলেন, মারধরকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
নড়াইল : নড়াইলে দুই দিনে শ্রমিক নেতা, সাবেক সেনাসদস্যসহ তিন ব্যক্তি খুন হয়েছেন। এ ছাড়া ঈদের রাতে ১০ বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর-লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার বিকালে লোহাগড়া উপজেলা সদরের লক্ষ্মীপাশা বাজারে আলুর দরদাম নিয়ে নড়াইল বাস-মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুনকে (৪৮) পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে কাঁচামাল ব্যবসায়ী ইদ্রিস শেখের বিরুদ্ধে। নিহত মামুন লোহাগড়া উপজেলার মহিষাপাড়া গ্রামের মৃত ওলিয়ার রহমানের ছেলে। শ্রমিক নেতা মামুনের সঙ্গে কাঁচামাল ব্যবসায়ী ইদ্রিসের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে ইদ্রিস তার দোকানে থাকা গামলা (ডিশ) দিয়ে মামুনের ঘাড় ও মাথায় আঘাত করে। এতে মামুন গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
লোহাগড়া থানার ওসি আশিকুর রহমান জানান, ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কাঁচামাল ব্যবসায়ী ইদ্রিসকে ঘটনার পর আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় কালিয়া উপজেলার জামরিলডাঙ্গা গ্রামে মোটরসাইকেলের সঙ্গে ভ্যানের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি আকরাম শেখ ও প্রতিপক্ষ আহমেদ লস্করের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ালে একপর্যায়ে আকরাম শেখ পক্ষের সমর্থক আবু তালেব শেখকে (৬৪) পিটিয়ে ও দেশি অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। এদিকে তালেবের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে টুকু লস্কর ও তার ভাই আলাউদ্দিন লস্করের দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল ইসলাম জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আটকে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া ঈদের দিন বিকালে লোহাগড়ার লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামে পূর্ববিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারে দুই পক্ষে সংঘর্ষে আকবর শেখ (৬৭) নামে এক সাবেক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ৭-৮ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামে মনিরুল জমাদ্দার ও মিল্টন জমাদ্দারের লোকজনের মধ্যে পূর্ববিরোধ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষে হাতাহাতি হয়। এর জেরে সোমবার বিকালে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। এতে মনিরুল-পক্ষীয় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে প্রতিপক্ষের লোকজন। পরে তাকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এদিন রাতে লোহাগড়া উপজেলার সত্রহাজারি গ্রামের ১০ বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীরা জানান, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বর্তমান ইউপি মেম্বার সাঈদ মিনার সঙ্গে সাবেক ইউপি মেম্বার আক্তার কাজীর পূর্ববিরোধ চলছিল। এর জের ধরে ঈদের দিনগত রাত ৮টার দিকে অতর্কিতভাবে আক্তার কাজীর লোকজন সাঈদ মিনা সমর্থক জলিল মোল্যা, মফিজুর মোল্যা, মান্নান মোল্যা, নজরুল মোল্যা, আবু তাহের মিনা, জব্বার মিনা, তারিকুল মিনা ও নাঈম মিনাসহ অন্তত ১০ পরিবারের ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে।
লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশিকুর রহমান জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার : জেলার টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পূর্ব মহেশখালিয়া পাড়া মাদক বাড়িতে মাদক সেবনে নিষেধ করায় ক্ষিপ্ত ভাসুরের ছুরিকাঘাতে জান্নাত আরা (২৭) নামের এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। গতকাল সকালে এ ঘটনায় নিহত গৃহবধূ নাগু মিয়ার ছেলে মো. ইসমাইলের স্ত্রী। হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ? মোজাহেরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলম জানান, নাগু মিয়ার পুত্র মাদকাসক্ত মো. ইব্রাহিম প্রকাশ লুতিয়া ঘুম থেকে উঠেই ঘরেই মাদক সেবনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় ছোট ভাই ইসমাইলের স্ত্রী জান্নাত আরা মেহমান আসবে বলে তাকে মাদক সেবন না করতে বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হন ইব্রাহিম প্রকাশ লুতিয়া। এ ছাড়া নিজ স্ত্রীর সঙ্গে কলহের জন্যও ছোটভাইয়ের স্ত্রী জান্নাত আরাকে দোষারোপ করে আসছিল। ক্ষুব্ধ হয়ে লুতিয়া প্রথমে গালিগালাজ ও পরে ঘরে ঢুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। এতে রক্তক্ষরণ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান গৃহবধূ জান্নাত আরা। ঘটনা সময় তার স্বামী মো. ইসমাইল কক্সবাজার ছিলেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে সালমা বেগম (২৫) নামে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। হত্যার পর তার কাছ থেকে টাকা লুট করা হয় বলে দাবি সালমার পরিবারের। সোমবার দিবাগত রাত ১১টার পর যে কোনো সময় তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে রাজবাড়ী সদর থানা পুলিশ সালমা বেগমের লাশ উদ্ধার করে। তিনি রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের হাউলি জয়পুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী আজাদ মল্লিকের স্ত্রী।
সালমার শাশুড়ি লতা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আজাদ দেড় বছর আগে সৌদি আরব যায়। এরপর তার স্ত্রী সামলা সাদিক নামে সাত বছরের ছেলে ও সিনহা নামে পাঁচ বছরের এক মেয়ে নিয়ে বাড়িতেই থাকত। সোমবার রাত ১১টার দিকে সালমা দুই সন্তান নিয়ে ঘুমাতে যায়। সকালে উঠে দেখি সাদিক ঘরের ভিতর কান্না করছে। বাইরে থেকে দরজা আটকানো। দরজা খুলে ঘরের ভিতর সামলার মৃতদেহ দেখতে পাই। তার গলায় ওড়না পেঁচানো ও শরীর কাঁথা দিয়ে ঢাকা ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে ঈদের আগে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। সালমাকে হত্যা করে ঘর থেকে টাকা ও তার নাকফুল নিয়ে গেছে।’
রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.মাহমুদুর রহমান বলেন, সামলা বেগম নামে এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে নিহতের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেছেন।