চোখের পলকে পার হয়ে গেল পবিত্র মাহে রমজান, যে মাসে মানুষ সাধ্য অনুযায়ী নেক আমল করার চেষ্টা করে। অন্যান্য সময়ের চেয়ে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত করে। মুমিনের উচিত গোটা বছর আল্লাহর ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়া, যতটা সম্ভব নেক আমলে আত্মনিয়োগের চেষ্টা করা। কারণ নেক আমলের তাওফিক লাভ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দার প্রতি অন্যতম বড় নিয়ামত।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘বলো, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার বদৌলতে (তা এসেছে), এ জন্য তারা আনন্দিত হোক। তারা যা স্তূপীকৃত করছে, তার চেয়ে তা (অর্থাৎ হেদায়েত ও রহমতপূর্ণ কোরআন) উত্তম।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫৮)
অর্থাৎ মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহ তাআলার রহমত ও অনুগ্রহকেই প্রকৃত আনন্দের বিষয় মনে করা এবং একমাত্র তাতেই আনন্দিত হওয়া। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ধন-সম্পদ, আরাম-আয়েশ ও মান-সম্ভ্রম—কোনোটাই প্রকৃতপক্ষে আনন্দের বিষয় নয়।
কারণ একে তো কেউ যত বেশি পরিমাণেই তা অর্জন করুক না কেন, সবই অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে; পরিপূর্ণ হয় না। দ্বিতীয়ত, সর্বদাই তার পতনাশঙ্কা লেগেই থাকে।
তাই আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘অর্থাৎ আল্লাহর করুণা-অনুগ্রহ সেইসব ধন-সম্পদ ও সম্মান-সাম্রাজ্য অপেক্ষা উত্তম, যেগুলোকে মানুষ নিজেদের সমগ্র জীবনের ভরসা বিবেচনা করে সংগ্রহ করে।’ এ আয়াতে দুটি বিষয়কে আনন্দের বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে।
একটি হলো ‘ফদল’, অন্যটি হলো ‘রহমত’।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.), ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ অনেক মুফাসসির বলেছেন, ফদল অর্থ কোরআন, আর রহমত অর্থ ইসলাম। [কুরতুবি]
জীবনকে কোরআন-হাদিস মোতাবেক পরিচালনা করতে পারাই মুমিনের প্রকৃত সফলতা। ধন-সম্পদ, জাঁকজমক, সন্তান-সন্ততি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা দীর্ঘ জীবন—এসবের কিছুই মূল্য নেই, যদি তা আল্লাহর জন্য না হয়। এ জন্যই আমাদের প্রিয় নবী (সা.) আখিরাতের জীবনকেই প্রকৃত জীবন বলে আখ্যা দিয়েছেন।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারগণ খন্দক যুদ্ধের পরিখা খননের সময় বলেছিলেন, আমরা হলাম ওইসব লোক, যারা মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে জিহাদের জন্য বায়াত গ্রহণ করেছি যত দিন আমরা বেঁচে থাকব। এর উত্তরে নবী (সা.) বলেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই আসল জীবন। (হে আল্লাহ) আনসার ও মুহাজিরদের সম্মান বাড়িয়ে দাও। (বুখারি, হাদিস : ৩৭৯৬)
তাই বলা যায়, নেক আমলের মুহূর্তগুলোই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। বরং এই সময়গুলোই প্রকৃত জীবন, যা সৎ ও নেককাররা অতিবাহিত করে। তাদের পার্থিব জীবনে একমাত্র সুখ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টিতে, তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টায়—তা ইবাদতের মাধ্যমেই হোক, উপকারী জ্ঞানের চর্চা হোক কিংবা কল্যাণময় কোনো দাওয়াতের মাধ্যমে হোক।
একজন সচেতন ও আন্তরিক মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি একদিকে যেমন আমলকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেন, তেমনি আমল শেষ করার পর কৃতকর্মের ত্রুটি-বিচ্যুতি ঢাকতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাআলা হজের বর্ণনায় এর প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তন করো, যেখান থেকে মানুষ প্রত্যাবর্তন করে; এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৯)
অতএব, আমাদেরও উচিত পবিত্র রমজানের ইবাদতগুলো যাতে আল্লাহর কাছে কবুল হয়, ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো যেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়, সে জন্য মহান আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা। আমলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা। নেক আমলের মধ্যেই প্রকৃত সুখ খোঁজার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃত সফলতার পথে পরিচালিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
বিডি প্রতিদিন/মুসা