ফতোয়া লেখায় দক্ষতা ও পরিপক্বতা অর্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো অভিজ্ঞ ও বিদগ্ধ মুফতির সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা। ফিকহি কিতাবগুলোর অধ্যয়ন ও অনুশীলন, বিশেষত কোনো নির্দিষ্ট ফিকহি গ্রন্থ, যেমন—‘রদ্দুল মুহতার’-এর পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়নও এই বিশেষজ্ঞ মুফতির দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।
হাকিমুল উম্মত হজরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন, ‘ফতোয়া লেখা প্রত্যেক ব্যক্তির কাজ নয়, যদিও সে ফিকহের কিতাবাদি অধ্যয়ন সম্পন্ন করে থাকে। হ্যাঁ, যদি কেউ বিজ্ঞ ও দক্ষ মুফতিদের সান্নিধ্যে এই কাজ অনুশীলন করে এবং তাঁরা তার কাজকে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেন, তাহলে সে ফতোয়া লেখার যোগ্য।
তবে এর পরও যদি কখনো ভুলত্রুটি হয়, তবে তা মানবীয় দুর্বলতার কারণে হতে পারে। একে অযোগ্যতা বলা যাবে না। ঠিক যেমন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে দীর্ঘদিন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অভিজ্ঞতা অর্জন করা ব্যতীত কেউ প্রকৃত চিকিৎসক হতে পারে না।’
(আদাবুল ইফতা ওয়াল ইস্তিফতা, পৃষ্ঠা-৪৮)
শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, ‘কেবলমাত্র ফিকহি কিতাবগুলোর বিভিন্ন মাসআলা মুখস্থ করলেই কেউ ফকিহ বা মুফতি হয়ে যায় না। কারণ, ফিকহ শব্দের অর্থই হলো ‘সঠিক উপলব্ধি ও গভীর অনুধাবন’। প্রকৃত ফকিহ সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা দ্বিনের গভীর উপলব্ধি দান করেছেন। আর এই যোগ্যতা কেবল ব্যাপক অধ্যয়ন বা মাসআলা মুখস্থ করার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, বরং এর জন্য প্রয়োজন হয় কোনো অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান ফকিহের সান্নিধ্যে থেকে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।’
(মেরে ওয়ালিদ মেরে শায়খ, পৃষ্ঠা-৬৫)
তাই যদি কেউ ফিকহ ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই একজন বিদগ্ধ মুফতির সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতে হবে, তাঁর দিকনির্দেশনায় অধ্যয়ন ও অনুশীলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
কেবলমাত্র এক বছর বা কয়েক মাসের ইফতা কোর্স সম্পন্ন করেই কেউ ফতোয়া লেখার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
ফতোয়ার সংজ্ঞা
ফতোয়া বলতে কোনো মাসআলার শরয়ি বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা করাকে বোঝায়। আল্লামা ইবনে আবেদিন আশ-শামি (রহ.) বলেন : ‘ফতোয়া দেওয়া হলো কোনো মাসআলার শরয়ি বিধান প্রদান করা।’
(রদ্দুল মুহতার, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-৬৭৩)
আল্লামা জুরজানি (রহ.) বলেন : ‘ফতোয়া হলো কোনো মাসআলার বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা।’
(আত-তারিফাত, পৃষ্ঠা-৪৯)
মুফতির সংজ্ঞা
‘মুফতি’ বলতে সাধারণত সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি কোনো মুজতাহিদের বক্তব্য ও মাসআলা যথাযথভাবে বর্ণনা করেন।
আল্লামা ইবনে আবেদিন আশ-শামি (রহ.) বলেন, ‘প্রকৃত মুফতি হলেন মুজতাহিদ, আর অন্যরা মূলত মুজতাহিদের বক্তব্যের বর্ণনাকারী মাত্র।’
(রদ্দুল মুহতার, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-৩৩)
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ফতোয়া দেওয়ার অর্থ হলো শরয়ি বিধান প্রকাশ করা। তবে বর্তমান যুগের বেশির ভাগ মুফতি মূলত মুজতাহিদের বক্তব্যের বর্ণনাকারী। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, যে কেউ চাইলেই ফতোয়া দিতে পারবে; বরং মুফতি হওয়ার জন্যও কিছু নির্দিষ্ট শর্ত ও আদব আছে, যা মুফতির মধ্যে বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য।
মুফতির জন্য শর্ত ও আদব
যে ব্যক্তি মুফতি হতে চান, তাঁর মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলি থাকতে হবে—
১. তাঁকে প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম, ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত হতে হবে।
২. তাঁকে পাপাচার ও খারাপ চরিত্র থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
৩. তাকওয়া ও পরহেজগারির গুণাবলি তাঁর মধ্যে থাকা অপরিহার্য।
৪. তাঁর মধ্যে ফিকহি জ্ঞানসম্পন্ন, প্রখর বুদ্ধির অধিকারী এবং সঠিক বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের যোগ্যতা থাকতে হবে।
৫. হঠকারিতা ও চাতুর্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বনকারীদের চিনতে পারার ক্ষমতা থাকতে হবে।
আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন, ‘মুফতির উচিত খারাপ চরিত্র থেকে মুক্ত থাকা, ফিকহি বোধসম্পন্ন হওয়া, বিশুদ্ধ মন ও চিন্তা-চেতনার অধিকারী হওয়া এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিশ্লেষণের যোগ্যতা রাখা।’
(আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-২৮৬)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘মুফতির জন্য শর্ত হলো—সে প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম, বিশ্বস্ত, পাপাচার ও নৈতিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত, ফিকহি জ্ঞানসম্পন্ন, বিশুদ্ধ চিন্তা-চেতনার অধিকারী, যুক্তিবাদী ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিশ্লেষণের যোগ্যতাসম্পন্ন হবে।’
(আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৪১)
মুফতি হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
এ ছাড়া একজন মুফতিকে অবশ্যই মাসআলাগুলোকে তার শর্ত ও সীমারেখাসহ জানার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তার মধ্যে প্রচলিত রীতি ও ঐতিহ্যের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। আর এটি তখনই সম্ভব, যখন সে কোনো দক্ষ মুফতির কাছে ইফতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে।
ইবনে আবেদীন আশ-শামি (রহ.) বলেন, ‘প্রথম যুগের আলেমরা মুফতির জন্য ইজতিহাদের শর্ত আরোপ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগে তা অনুপস্থিত। তাই কমপক্ষে মুফতির মধ্যে এই শর্ত থাকা উচিত যে সে মাসআলাগুলোকে তার শর্ত ও সীমাবদ্ধতাসহ জানে এবং এ বিষয়ে দক্ষ কোনো শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।’
(শরহু উকুদি রসমিল মুফতি, পৃষ্ঠা-১৫৬)
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা
উপরোক্ত সংজ্ঞা ও শর্তাবলি যদি বিবেচনা এবং চিন্তা করা হয়, তাহলে বর্তমানে কি শুধু দরস-এ-নিজামি (সিলেবাস) সম্পন্ন করলেই কেউ ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে? গভীর দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট হবে, ফতোয়া দেওয়া তো দূরের কথা, অনেক দরস-এ-নিজামি (সিলেবাস) সম্পন্নকারীও প্রকৃত অর্থে ‘আলিম’ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
একজন মুফতির জন্য শুধু কিতাব মুখস্থ করলেই হয় না, বরং তার মধ্যে ফিকহি বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে, শরয়ি বিধান ও নিয়মাবলি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে এবং সমকালীন সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও লেনদেনের রীতিনীতি সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।
এ জন্যই ইবনে আবেদিন আশ-শামি (রহ.) সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে মুফতি হওয়ার জন্য অবশ্যই কোনো দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা আবশ্যক। এমনকি ‘মুনিয়াতুল মুফতি’ নামক গ্রন্থে স্পষ্ট বলা হয়েছে—‘যদি কেউ আমাদের ইমামদের সব ফিকহি কিতাব মুখস্থও করে ফেলে, তবু তাকে ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না, যতক্ষণ না সে কোনো দক্ষ শিক্ষকের নিকট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।’
(শরহু উকুদি রসমিল মুফতি, পৃষ্ঠা-১৫৬)
যারা মনে করে যে ফতোয়া প্রদানের জন্য বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার দরকার নেই, বরং শুধু নিজে পড়াশোনা করলেই বা দরস-ই-নিজামী (সিলেবাস) সম্পন্ন করলেই কেউ মুফতি হয়ে যায়, তাদের এই ভুল ধারণা পরিত্যাগ করা উচিত।
ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব নির্ধারণের গুরুত্ব
এটি সুস্পষ্ট যে প্রত্যেক আলেম বা ফিকহ বিশেষায়িত ছাত্র মুফতির দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে—এটি জরুরি নয়। তাই সময়ের দাবি হলো যে সুপ্রতিষ্ঠিত মুফতিরা সততার সঙ্গে এই আলেমদের পর্যবেক্ষণ করুন এবং যাদের সত্যিকারভাবে ফতোয়া লেখার যোগ্যতা রয়েছে, কেবল তাদের এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করুন। যদিও এটি মূলত শাসকের দায়িত্ব, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশেষত ভারত উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে ইসলামী বিচারব্যবস্থার এমন কোনো সংগঠিত কাঠামো নেই, সেখানে স্বীকৃত মুফতিদের অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে অযোগ্য ব্যক্তিদের কারণে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে বা ভবিষ্যতে হবে, তার ক্ষতিপূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন : ‘শরহু রাওদ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে শাসকের উচিত তার সময়ের বিশিষ্ট আলেমদের জিজ্ঞাসা করা যে কে ফতোয়া প্রদানের যোগ্য, এবং যিনি অযোগ্য তাকে নিষেধ করা এবং শাস্তির ভয় দেখানো।’ (আল-বাহরুর রায়েক, শারহু কানজিদ দাকায়েক, খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-২৮৬)
তবে অতি পরিতাপের বিষয় হলো—মুফতি হতে ও ফতোয়া লিখতে নির্দিষ্ট শর্ত থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে শত শত স্বঘোষিত মুফতি তৈরি হচ্ছে, আর এর নেপথ্যে রয়েছে আমাদের দেশের সিস্টেম কাঠামোর গড়িমসি। আজ শহরের অলিগলি ও সর্বত্র দেখা যাচ্ছে ফতোয়া বিভাগের ছড়াছড়ি। এমনকি অনলাইন ও মাসিক কোর্সের মাধ্যমেও আজকে মুফতির সনদ দেওয়া হচ্ছে! আমরা কতটা সস্তা ও নরমাল করে ফেলেছি ইসলামী শরিয়তের এত বড় মানদণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে!
পরিশেষে, শুধু দরস-ই-নিজামি (সিলেবাস) সম্পন্ন করাকে ফতোয়া প্রদানের জন্য যথেষ্ট মনে করলে তা ইসলামের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিজেদের যোগ্যতার সীমা বুঝে কাজ করার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : চিন্তক ও ইসলামী অর্থনীতিবিদ
এবং বিভাগীয় প্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক : ফতোয়া ও ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ ‘আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।
‘দারসুল ফিকহ ও সমকালীন প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক লেকচার থেকে অনুলিখন আসআদ শাহীন
বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ