চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ট্রাজেডিতে আহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা (১৮) চলে গেছেন না ফেরার দেশে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলো ১১ জনের।
তাসনিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের আর কেউ বেঁচে থাকল না। অন্যদিকে এ দুর্ঘটনায় আহত শিশু আরাধ্য বিশ্বাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতাল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
জানা যায়, গত বুধবার সকালে লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়া চুনতি বন রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে মারা যান ১০ জন। এর মধ্যে ছিলেন একই পরিবারের পাঁচ সদস্য রফিকুল ইসলাম শামীম (৪৬) ও তাঁর স্ত্রী লুৎফুন নাহার সুমি (৩৫), তাঁদের দুই মেয়ে ৮ বছরের লিয়ানা এবং ১৪ বছরের আনিশা আক্তার, শামীমের ভাগনি ১৬ বছরের তানিফা ইয়াসমিন। দুর্ঘটনায় আহত প্রেমাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তিনি শামীম-সুমি দম্পতির বড় মেয়ে। দুর্ঘটনার পর থেকেই তাসনিয়া সংজ্ঞাহীন ছিলেন। শুরু থেকেই তাঁকে চমেকের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছিল।
প্রেমার মামি জেসমিন রহমান বলেন, চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির জ্ঞান ফেরানো যায়নি। গত তিন দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন প্রেমা। শেষ পর্যন্ত গতকাল দুপুরে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এখন পুরো পরিবারটিই শেষ।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হারুনুর রশিদ বলেন, দুর্ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। গতকাল দুপুরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রেমার হাতে ছিল মেহেদি
ঈদের আনন্দকে রাঙাতে প্রেমা হাতে দিয়েছিলেন মেহেদি। সেই মেহেদির রঙ শুকায়নি এখনও। নকশা করা দাগগুলো এখনও উজ্জ্বল। মেহেদির রঙ উজ্জ্বল থাকলেও প্রেমার দেহে নেই প্রাণ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে নিথর দেহ। অক্সিজেন মাস্ক, স্যালাইন আর শারীরিক লড়াইয়ের সমস্ত চিহ্ন নিয়েই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। একটি সড়ক দুর্ঘটনা নিশ্চিহ্ন করে দিল একটি পরিবার। এক ঘটনাই একটি পরিবারের স্বপ্নগুলোকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিল। নিঃশেষ করে দিল একটি পরিবারের সুখ-দুঃখের ইতিহাস।
ঢাকার মিরপুরে পরিবার নিয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করতেন রফিকুল ইসলাম শামীম (৪০)। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে একসঙ্গে সময় কাটানোর জন্য ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তাঁরা। দুর্ঘটনার পর পরিবারটির অন্যান্য সদস্যদের মরদেহ কদমতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। এখন প্রেমার মরদেহও একই পথ ধরে গ্রামে যাবে। এক পরিবারের সবার কবর হবে একসঙ্গে।
ঢাকায় স্থানান্তর আরাধ্য
লোহাগাড়ার দুর্ঘটনায় আহত শিশু আরাধ্য বিশ্বাসের অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুর্ঘটনাস্থলেই মারা যান আরাধ্যের বাবা দিলীপ বিশ্বাস ও মা সাধনা বিশ্বাস।
চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির মাথায় আঘাত লেগেছে, শরীরের অন্যান্য স্থানেও জখম আছে। দুই পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছে। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। এখন চমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত দুর্জয় কুমার মণ্ডল (১৮)। তিনি শিশু আরাধ্যের স্বজন।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বলেন, আহত আরেক শিশু আরাধ্যাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহত দুর্জয় নামে একজন এখানে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনাস্থলে বসল গতিরোধক
লোহাগাড়ার চুনতি জাঙ্গালিয়ায় দুর্ঘটনাস্থলে বসানো হয়েছে ৫-৬টি গতিরোধক (স্পিড ব্রেকার)। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এসব গতিরোধক বসিয়েছে। পাশাপাশি সড়কের পাশে বসানো খুঁটিতে উড়ছে লাল নিশানা।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই এলাকার মহাসড়কের একপাশে চুনতি অভয়ারণ্য, আরেক পাশে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ডাকাতিপ্রবণ এলাকা জাঙ্গালিয়া। এখানে অপরিকল্পিত গতিরোধকের কারণে সমস্যা বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগ দক্ষিণ-এর উপপ্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, দুর্ঘটনা রোধে ৭-৮ ইঞ্চি উচ্চতার এসব গতিরোধক বসানো হয়েছে।
দোহাজারী থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমা বলেন, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামমুখী সড়কের জাঙ্গালিয়া তুলনামূলক ঢালু এবং ডান দিকে বাঁক আছে। ফলে এখানে দ্রুতগতির গাড়ি বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখার পর গতি কমানোর সুযোগ পায় না। এই গতিরোধকের কারণে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রিত হবে, দুর্ঘটনা কমবে।
বিডি প্রতিদিন/আশিক