একুশে গ্রন্থমেলা
‘একুশে গ্রন্থমেলা’ হিসেবে পরিচিত এ মেলার আরেক নাম ‘প্রাণের মেলা’। প্রতিবছর বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি এ মেলার আয়োজন করে। ফেব্রুয়ারি জুড়ে চলা এ বইমেলা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলা একাডেমি চত্বরে অনুষ্ঠিত হতো।
তবে ২০১৪ সাল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত মেলার পরিধি বাড়ানো হয়। ১৯৫২ সালের ভাষাশহীদদের প্রতি অমর একুশে গ্রন্থমেলা উৎসর্গ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো শহীদদের উদ্দেশ্যে বইমেলার আয়োজন বিশ্ব বইমেলার ইতিহাসে বিরল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণের বটতলায় একুশে বইমেলার সূচনা হয়। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের ৩২টি বই চটের ওপর সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান। ১৯৭৬ সালে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। এ সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। মেলা চলাকালীন সারা মাস নজরুল মঞ্চে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি।
এ মেলার প্রবেশমূল্য নেই। প্রচুরসংখ্যক ক্রেতা-দর্শনার্থী মেলায় আসেন, বই দেখেন, কেনেন ও লেখককুঞ্জে তাদের প্রিয় লেখক-কবিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মেলায় বই বিক্রি হয় কমিশনে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গুণীজনদের বিশেষ সম্মাননা দিয়ে থাকে।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো বইমেলাগুলোর একটি। এটি ৫০০ বছরেরও প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। বর্তমানে এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা। জার্মানিতে একে বলে ফ্রাঙ্কফুর্টার বুচমেস। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জোহানস গুটেনবার্গের নাম। প্রায় ৫০০ বছর আগে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের একদম কাছে মেঞ্জ শহরে গুটেনবার্গ সহজে বহনযোগ্য মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার পরপরই মুদ্রণশিল্পে বিপ্লব ঘটে। রাতারাতি বইয়ের দাম কমে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসে। এর আগ পর্যন্ত বই লিখতে হতো হাতে। তাতে সময় আর শ্রমের পাশাপাশি দামও হতো প্রচুর। তাই সে সময় জার্মানির চার্চের লাইব্রেরির বই হারানোর ভয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। কিন্তু গুটেনবার্গের ছাপাখানা বিপ্লবের কিছুদিন পর ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে স্থানীয় কিছু বই বিক্রেতার আগ্রহে ছোট আকারে একটি বইমেলার আয়োজন করা হয়। ধীরে ধীরে এ মেলা দর্শক-ক্রেতা-পড়ুয়া সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৭ শতক পর্যন্ত এ মেলাই ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইমেলায় পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে লিপজিগ বইমেলায় এ মেলা স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৯ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা সেইন্ট পলস গির্জায় আবার শুরু হয়। তাতে এ বইমেলা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পায়। ১৫ বছর পর ১৯৬৪ সালে মেলাটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। পাঁচ দিনব্যাপী এ মেলা শুরু হয় অক্টোবর মাসে। প্রথম তিন দিন শুধু বই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা অংশ নিতে পারেন; বাকি দুই দিন সাধারণ দর্শকরা মেলায় ঢোকার সুযোগ পান। প্রতিবছর সারা বিশ্ব থেকে এখানে হাজার হাজার প্রকাশক, বিক্রেতা, লেখক, পাঠক, দর্শক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ অনেকে অংশ নেন। মেলার আয়োজন করে জার্মান পাবলিশার অ্যান্ড বুক সেলার অ্যাসোসিয়েশন। বর্তমানে প্রতিবছর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেড ফেয়ার গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয় এ বইমেলা।
প্যারিস
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আয়োজিত বিশ্বখ্যাত বইমেলা এটি। ১৯৮১ সালে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্যারিস শহরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে মেলাটি লেখক, শিল্পী ও পাঠকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও আলোচনার মঞ্চ তৈরি করেছে। ফরাসি লেখক ও কবিদের নতুন বই এ মেলা ঘিরে প্রথম প্রকাশিত হয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, চিলি, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ এ মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। প্যারিস বইমেলা শুধু বই নয়, চিত্রকলার মতো অন্যান্য শিল্পকলা প্রদর্শনের এক বিস্ময়কর মিলনমেলা।
টোকিও
জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয় আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বইমেলা। এশিয়ার জনপ্রিয় বইমেলা হিসেবে এটি পরিচিত। সেখানে প্রযুক্তি ও সাহিত্য একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে স্থান পায়। ১৯৫১ সালে মেলার যাত্রা শুরু হয়। তখন থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। সাহিত্য ও প্রকাশনা শিল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাপানি সাহিত্যকে পরিচিত করাই এর উদ্দেশ্য। এখানে ই-বুক, অডিওবুক ও ডিজিটাল প্রকাশনার নতুন দিক নিয়ে সেশন ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। থাকে নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত ও শিল্পকলা প্রদর্শনী। এ ছাড়া সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আলোচনা ও কর্মশালার আয়োজনও থাকে।
মস্কো
শরতের সময় আয়োজিত এ বইমেলা প্রথম শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর। এরপর থেকে প্রতিবছর ৩ থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মস্কো এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় মস্কো ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ার। এখানে রাশিয়াসহ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো অংশ নেয়। পাঠকরা বিশেষ মূল্যে বই কিনতে পারেন। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হয় মস্কো বইমেলা। এরপর থেকে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের তিন তারিখ থেকে সাত তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এ মেলা। আমাদের একুশে বইমেলার শিশু কর্নারের মতো মস্কো বইমেলায়ও শিশুদের জন্য রয়েছে ‘লেটস রিড’ নামে কর্নার। একুশে বইমেলার মতো মস্কো মেলা শেষেও লেখকদের সম্মানসূচক পুরস্কার দেওয়া হয়। রুশ সাহিত্য জগতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন মস্কো আন্তর্জাতিক বইমেলা। প্রতিবছর ছয় দিনের এ আয়োজনে স্বাগত জানানো হয় দুই লাখের বেশি বইপ্রেমীকে। তাদের জন্য বই নিয়ে আসে ৬০টির বেশি দেশের দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব সাহিত্যে রুশ সাহিত্যিকদের অবদান অবিস্মরণীয় বলে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এ মেলা।
কায়রো
আরব বিশ্বের প্রাচীন ও বৃহত্তম বইমেলা এটি। এ মেলা জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয়; চলে তিন সপ্তাহ। মেলায় আরবি, ইংরেজিসহ নানান ভাষার বই পাওয়া যায়। পৃথিবীতে আরবি ভাষায় রচিত বইগুলোর গড়ে প্রতি পাঁচটির তিনটিই প্রকাশ করে কায়রোভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো। তাই আরববিশ্বে বইয়ের জন্য সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠেছে এ মেলার। লোকসমাগম হয় প্রায় ২০ লাখ। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা হিসেবে এর অবস্থান। ১৯৬৯ সালে কায়রো শহর প্রতিষ্ঠার ১ হাজার বছরপূর্তি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক এ বইমেলা শুরু হয়। মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই মাদিনাতু নাসারের কায়রো ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার গ্রাউন্ডে এ মেলার আয়োজন করে ‘জেনারেল ইজিপশিয়ান বুক অর্গানাইজেশন’। ৮০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এ মেলায় ৭৭টি দেশের ১ হাজার ২০০ প্রকাশনী সংস্থা অংশগ্রহণ করে। বই প্রদর্শনীর পাশাপাশি মেলায় ৫৫০টি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কায়রো বইমেলায় প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের পাঁচ পাউন্ড মূল্যের টিকিট ক্রয় করতে হয়।
লন্ডন বইমেলা
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর এ মেলার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ১০০টিরও বেশি দেশ এ মেলায় অংশ নেয়। প্রতিবছর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি লন্ডনে আয়োজিত হয় এ মেলা। ইউরোপিয়ান প্রকাশক, বিক্রেতা, এজেন্টদের তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত লন্ডনের এ বইমেলা। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এ মেলা চলত অলিম্পিয়া এক্সিবিশন সেন্টারে। সে বছর এটি সরিয়ে নেওয়া হলেও ২০১৫ সালে আবার সেখানে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে সেখানেই এ আয়োজন চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। লন্ডনের এ বইমেলায় সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয়। প্রায় দুই হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত লন্ডন বইমেলায় তিন দিন ধরে চলে দুই শতাধিক ইভেন্ট। যেখানে বিভিন্ন নামজাদা বক্তারা বক্তব্য রাখেন; থাকে আলাপচারিতা, প্রশ্নোত্তর পর্ব। বইমেলার ভিতরে থাকে ‘অথর্স এইচকিউ’, ‘চিলড্রেনস্ হাব’, ‘ক্রস-কালচারাল হাব’-এর মতো অসংখ্য বিভাগ। এ বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘অথর্স অব দ্য ডে’ ও ‘ইলাস্ট্রেটর অব দ্য ফেয়ার’ প্রোগ্রাম। মেলা আয়োজনের নির্দিষ্ট তারিখ না থাকলেও সারা বিশ্বের বইপ্রেমীদের জন্য এর গুরুত্ব অনেক। এ বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশকরা বিভিন্ন বিষয়ে দুর্লভ সব প্রকাশনা বের করেন। ২৫ হাজারের বেশি প্রকাশক, বই বিক্রেতা, এজেন্ট, লাইব্রেরিয়ান ও গণমাধ্যমকর্মী এ মেলায় অংশ নেন। লন্ডন বইমেলা মূলত বই প্রকাশনা-বাণিজ্যের দিক দিয়ে বড়। সাধারণত প্রতিবছরের মার্চে ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ বইমেলা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার চেয়ে বড় না হলেও ইদানীং এর আয়তন ও গুরুত্ব বাড়ছে। প্রকাশকরা তাদের প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচার এবং বইয়ের স্বত্ব বা অন্য ভাষার অনুবাদস্বত্ব বেচাকেনার জন্য এ মেলায় আসেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা যেমন সাধারণ পাঠকদের অংশগ্রহণে মুখর থাকে, তার প্রায় বিপরীত অবস্থা দেখা যায় লন্ডন বইমেলায়। এখানে সাধারণ পাঠকদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
আরও যত বইমেলা
আমেরিকা
আমেরিকা
১৯৪৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘আমেরিকান বুকসেলার অ্যাসোসিয়েশনের কনভেনশন অ্যান্ড ট্রেড শো’ নামে শুরু হয় বই নিয়ে এ আয়োজন। ১৯৭১ সালে নাম বদলে ‘বুক এক্সপো আমেরিকা’ রাখা হয়। দেশটির বড় বড় শহরে পালাক্রমে চলে এ বইমেলা। ২০০৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক সিটিতে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালে এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে শিকাগোয় হয়েছে এ মেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘দ্য বুককর্ন’; যা মূলত গল্প বলা ও সংস্কৃতি প্রদর্শন। এটি আমেরিকার সবচেয়ে বড় বইমেলা। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহরে বসে এ মেলা। মূলত প্রাচীন বই, পা-ুলিপি, ছাপার কাগজ, মানচিত্র ইত্যাদি প্রদর্শনী ও বিক্রির মেলা এটি। আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় ৩০টি দেশ এ মেলায় অংশগ্রহণ করে।
ইতালি
ইতালি
শিশুসাহিত্যের জন্য ‘বলগান চিলড্রেনস বুক ফেয়ার’ প্রধান বইমেলা। বিশ্বজুড়ে সবার কাছে এ বইমেলা অসম্ভব জনপ্রিয়। ১৯৬৩ সাল থেকে প্রতিবছর মার্চ ও এপ্রিলের চার দিন এ মেলা ইতালির বলগানে অনুষ্ঠিত হয়। শিশুসাহিত্য, শিশুচলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন নিয়ে যারা কাজ করেন, তারাই মূলত এখানে শিশুসাহিত্য সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করতে আসেন। শিশুদের বইয়ের লেখক-প্রকাশকসহ নানা পেশার লোকজনের সমাগম হয়। অনুবাদ ও বই থেকে অন্য মাধ্যমে শিল্প তৈরির জন্য এখানে বইয়ের স্বত্ব কেনাবেচা হয়। শিশুদের বই থেকে যারা শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তারা মূলত এখান থেকে বইয়ের স্বত্ব কিনে নেন। এ ছাড়া মে মাসের মাঝামাঝি ইতালির তুরিনে অনুষ্ঠিত হয় তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা। এটি ইতালির সবচেয়ে বড় বইয়ের বাণিজ্যমেলা। এ মেলা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। সে বছরের ১৮ মে উদ্বোধন করা হয় মেলাটি। উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী রুশ কবি যোসেফ ব্রডস্কি। ব্যবসায়ী গিদো আকোনেরো ও বই বিক্রেতা আনজেলো পেজানা বইমেলার নাম দেন মেলোন দেল লিব্রো। পরবর্তীতে নাম রাখা হয় তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা। ২০১৫ সালে এখানে ১ হাজার ৪০০ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সে বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজারের বেশি।
আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ারস শহরে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলাটি মূলত স্প্যানিশ সাহিত্যকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে। অন্তত ৫০টি দেশের অংশগ্রহণে এ মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখে। আর্জেন্টাইন সোসাইটি অব রাইটার্সের প্রতিষ্ঠিত ‘ফান্দাসিঁও এল লিব্রো’ নামক অলাভজনক সংস্থা এ বইমেলার আয়োজন করে। বিশ্বের সেরা পাঁচটি বইমেলার মধ্যে অন্যতম এটি। লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, অনুবাদক, বিক্রেতা এবং প্রকাশনার সঙ্গে জড়িতদের অংশগ্রহণে কনফারেন্স ও সভা উন্মুক্ত থাকে সবার জন্য। গবেষক ও লাইব্রেরিয়ানদের নিয়ে বিশেষ কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়।
হংকং
হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এ বইমেলা। ওয়েলসের ব্রেকনকশায়া জেলার ছোট শহর হে-অন-ওয়ে; যার সংক্ষিপ্তরূপ ‘হে’। হে’কে বলা হয় ‘বইয়ের শহর’। আসলে এটা ওয়েলসের জাতীয় বইয়ের শহর। এ বইমেলা শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে। প্রতিবছর মধ্য জুলাইয়ে এ মেলা শুরু হয়। হংকং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত মেলার উদ্দেশ্য হংকংয়ের জনগণের জন্য কম দামে দেশি-বিদেশি বই পৌঁছে দেওয়া। এ মেলা মূলত আন্তর্জাতিক বই ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। ১০ দিনব্যাপী চলা এ আসরে প্রায় ৮০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হয়। হংকংয়ে কমিকসের বই খুবই জনপ্রিয়। হংকংবাসী একে এনি-কম হংকং বলেন। এ কারণে এখানে আলাদাভাবে কমিকস মেলাও অনুষ্ঠিত হয়।
আবুধাবি
সাহিত্য-পঞ্জিকার বড় মেলাগুলোর মধ্যে নতুন এ বইমেলা। বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্য ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার সহযোগে আবুধাবি কর্তৃপক্ষ এ মেলার আয়োজন করে। এর মাধ্যমে আরব আমিরাত প্রকাশনা জগতের বৈশ্বিক প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে চায়। বইয়ের শর্ত ও অনুমতিপত্র কিনতে দরাদরির জন্য এ মেলার গুরুত্ব অনেক। এ ছাড়া আরবের ভাষা, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকান প্রকাশকদের জন্য এটি সেরা বইমেলা। মার্চের ১৫ থেকে ২০ তারিখে এ মেলা শুরু হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বইমেলা এটি।
মেক্সিকো
মেক্সিকান শহর গুয়াদালাজারা স্প্যানিশ ভাষার এ বইমেলার আয়োজন করে। এ মেলা বইয়ের জগতের পেশাদারদের জন্য সবচেয়ে ভালো বাণিজ্যিক পরিবেশ নিশ্চিত করে। পাঠকদের মনেও অনন্য অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এটি স্প্যানিশ ভাষাভাষীদের জন্য প্রখ্যাত বইমেলা। মেক্সিকোর জালসিকোতে এটি আরম্ভ হয় প্রতিবছর নভেম্বরের শেষ শনিবারে। চলে একটানা ৯ দিন।
তেহরান
তেহরান
ইরানের রাজধানী তেহরানে ২৪ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয় তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা। ইসলাম, ইরান, বিশ্ব ও শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস এবং প্রতিরক্ষাযুদ্ধ সংক্রান্ত বইয়ের জন্য এ বইমেলা বিখ্যাত। বাংলাদেশের বইমেলার সঙ্গে এ মেলার একটি বিশেষ মিল রয়েছে। তেহরান বইমেলাও ইরানিদের কাছে প্রাণের মেলার মতো। লেখক-পাঠক আর গ্রন্থানুরাগীদের ভিড়ে প্রতিদিনই মেলা থাকে জাঁকজমকপূর্ণ। প্রতিবছর মে মাসের ৪ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
চীন
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে প্রতিবছর বেইজিং আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় চীনা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাহিত্যও গুরুত্ব পায়। এ বইমেলা ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। তারপর থেকে এটি চীনের প্রকাশনাশিল্পের প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছে। বেইজিং বইমেলা চীনা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসারকে গুরুত্ব দেয়। এখানে চীনা লেখক ও কবিদের নতুন কাজের পাশাপাশি প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের পুরনো কাজও স্থান পায়। মেলায় চীনের সাহিত্যিক ঐতিহ্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
গোথেনবার্গ
সুইডেনের অনন্য সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন এটি। নর্ডিক অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ এ বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, বৈশ্বিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের গোথেনবার্গ শহরে আয়োজিত হয় এ মেলা। নর্ডিক ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যিকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
কলকাতা
প্রতিবছর এ মেলায় প্রায় ৩ লাখ পাঠক সমাগম হয়। এর প্রচলিত নাম ‘কলকাতা বইমেলা’। ১৯৭৬ সালে শুরু হয় এ বইমেলা। জানুয়ারির শেষ বুধবার থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম রবিবার পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী আয়োজিত এ মেলায় বাংলাদেশের জন্যও আলাদা প্যাভিলিয়ন থাকে। কলকাতা বইমেলার ব্যাপক জনপ্রিয়তার জন্য ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কর্তৃপক্ষ একে ‘গেস্ট অব অনার’ মনোনয়ন দিয়েছে। ১৯৭৬ সালে প্রবর্তিত এ মেলা ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে। মেলার বর্তমান আয়োজনস্থল পূর্ব কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণ।