যশোর শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে যশোর-চৌগাছা সড়কের পাশে ৩৫ একর জায়গায় গড়ে ওঠা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) দেশে-বিদেশে আলো ছড়াচ্ছে। শিক্ষা ও গবেষণায় অনেক প্রবীণ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও এগিয়ে গেছে বয়সে নবীন যবিপ্রবি। ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৯ সালের ১০ জুন শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। ১৮ বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে আলোচিত বহু অর্জনকে নিজের করে নিয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে যবিপ্রবি যৌথভাবে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যবিপ্রবিতে বর্তমানে আটটি অনুষদ ও ২৮টি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগে মোট ৪ হাজার ৬২২ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন ৩৪৭ জন। কর্মকর্তা ১৬৩ এবং কর্মচারী ৩১২ জন। দুটি একাডেমিক ভবন আছে। আছে ৭০০ আসনের ৫ তলাবিশিষ্ট এবং ৩৫০ আসনের ১০ তলাবিশিষ্ট দুটি ছাত্রী হল। এ ছাড়া এক হাজার আসনের পাঁচ তলাবিশিষ্ট এবং ৪০০ আসনের ১০ তলাবিশিষ্ট দুটি ছাত্র হলও রয়েছে।
গবেষণা : ২০২২ সালে যবিপ্রবির প্রকাশিত মোট গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৩৫০টি। প্রতি বছর এলসেভিয়ার ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ইউএসএ সম্মিলিতভাবে বিশ্বসেরা ২% বিজ্ঞানীর তালিকা প্রকাশ করে থাকে।
২০২২ সালে যবিপ্রবির তিনজন বিজ্ঞানী এ তালিকায় স্থান পান। এ ছাড়া ২০২১ সালে যবিপ্রবির তৎকালীন উপাচার্য বিশিষ্ট অণুজীব বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে একুশে পদক পান।
করোনাকালীন অবদান : করোনা মহামারির সময়ে যবিপ্রবির জিনোম সেন্টার অসামান্য অবদান রাখে। ২০২০ সালে ৮ মার্চ থেকে দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২০২০-এর ১৭ এপ্রিল থেকে যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারে করোনা শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা এই জিনোম সেন্টার থেকে পরীক্ষা করা হয়। এ পর্যন্ত এক লাখ ২৬ হাজার নমুনা এখান থেকে পরীক্ষা করা হয়েছে। জিনোম সেন্টারের ল্যাবের মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু-এর মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। জিনোম সেন্টারের ফলাফল শতভাগ সঠিক বলে সনদ দিয়েছে হু। যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে প্রচুর সংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে যাওয়া-আসা করেন। তাদের জন্য করোনা পরীক্ষা করে সনদ দেওয়ার কাজও করেছে যবিপ্রবির এই জিনোম সেন্টার। এই ল্যাব থেকেই দেশে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভেরিয়েশন শনাক্ত এবং এর জীবন রহস্য উন্মোচন করা হয়। এখানকার বিজ্ঞানীরা কভিড-১৯ শনাক্তের কীটও আবিষ্কার করেন।
ফিশ মিউজিয়াম : যবিপ্রবির ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স (এফএমবি) বিভাগ ২০১৯ সালে অ্যাকুয়াটিক বায়োডায়ভার্সিটি মিউজিয়াম নামে একটি ফিশ মিউজিয়াম গড়ে তোলে। এতে সংরক্ষিত আছে ৪৭৫ প্রজাতির স্বাদু ও সামুদ্রিক প্রাণী। মিউজিয়ামে সংরক্ষিত বিলুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় মাছ ও অন্য জলজ প্রাণী শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অনেক কাজে লাগছে।
হ্যাচারি অ্যান্ড ওয়েট ল্যাব : বিশ্বমানের হ্যাচারি হিসেবে যবিপ্রবির হ্যাচারি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। গবেষণা, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি এই হ্যাচারি থেকে যশোর অঞ্চলের মৎস্যচাষিদের উন্নতমানের পোনা সরবরাহ করে থাকে। বর্তমানে রুই, মৃগেল, কাতলা, ব্রিগেট কার্প, বাটা, সিলভার কার্প ও পাঙ্গাশ মাছে উন্নতমানের পোনা উৎপাদন করা হয় ল্যাবটিতে।
আগামীতে শিং, মাগুর, পাবদা, খলশা, চিংড়ির পোনা নিয়েও কাজ করা হবে এখানে। জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. আবদুল মজিদ। আগামীর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, বর্তমানের ৩৫ একরের ক্যাম্পাসকে বর্ধিত করে একশ একর করা হবে। যবিপ্রবিতে মলিকুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করা হবে। এতে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
যশোর শহরেও এই সেন্টারের একটি বুথ থাকবে, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ পরীক্ষার জন্য সেখানে তাদের স্যাম্পল দিতে পারে। যবিপ্রবিতে ওষুধের ল্যাবও স্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান। উপাচার্য বলেন, বর্তমানে যবিপ্রবিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার গবেষণা উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা ও রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হবে।