১৯ বছর বয়সি বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৬৬ বছরের ইতিহাস। ১৮৫৮ সালে ‘ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল’ নামে যাত্রা শুরু করেছিল যে প্রতিষ্ঠানটি, নানা পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেটিই এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাস পুরান ঢাকায়। আয়তন সাত একর।
রাজধানীর টানে : ঢাকা শহরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুব বেশি নেই। এ কারণেও ভর্তির ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরপরই অনেকের দ্বিতীয় পছন্দের অবস্থানে থাকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মারিয়া ইসলাম বলছিলেন, ‘ঢাকায় পড়াশোনা করার ইচ্ছা থেকেই মূলত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেছি। পুরান ঢাকার নিজস্বতা, এখানকার মানুষের আতিথেয়তা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজধানী শহরকেন্দ্রিক পড়াশোনার জন্যই এখানে আসা।’
গ্রাম থেকে ছুটে আসেন শিক্ষার্থীরা : শহরের আনাচেকানাচে থেকেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জগন্নাথে পড়তে আসেন শিক্ষার্থীরা। সুদূর রংপুরের তেঁতুলিয়া থেকে শুরু করে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকেও ভর্তি হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। যেমন বাংলা বিভাগের ছাত্রী সুমাইয়া তাবাসসুম কুমিল্লা থেকে এসেছেন। সুমাইয়া বলেন, আগে মেসে থাকলেও এখন হলে সিট পেয়েছি। ঢাকার এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাস জীবন উপভোগই করি। গ্রাম থেকে শুধু ঢাকায় থাকব বলে এখানে ভর্তি হয়েছি। আমার মতো অধিকাংশ শিক্ষার্থীই রাজধানীতে এসেছেন পড়াশোনার ক্ষেত্রে আধুনিক সব সুবিধা পেতে।
পরিবহন সুবিধা : অনাবাসিক হওয়ায় এখানকার পরিবহন সুবিধা সবচেয়ে বেশি। শুধু গাজীপুর কিংবা মানিকগঞ্জ নয়, সুদূর কুমিল্লা, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ থেকে শুরু করে রাজধানীর সব রুটে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত বাস সেবা। রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী রকি বলেন, ‘প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করার একটা আলাদা মজা আছে। সকালে যখন লাল বাসে করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, সবাই আলাদা চোখে দেখে। আর বিকেলে বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে, সবাই মিলে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরার আনন্দ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বড় প্রাপ্তি।’
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় : নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুই দশকে পদার্পণ করেছে হলবিহীন অনাবাসিক ক্যাম্পাসটি। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি সবক্ষেত্রে নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে জাগা-বাবুর পাঠশালা খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টি।
কেন জগন্নাথ সেরা : ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর থেকে যাত্রা শুরু করে ২০২৪ সালে দুই দশক পূর্ণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশে থেকেও এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জিং সব কাজ করে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে দেশের অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। কখনো-বা পড়াশোনায়, কখনো চাকরির বাজারে; আবার কখনো খেলাধুলায় কিংবা রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে। দেশ-বিদেশে আলো ছড়াচ্ছেন এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক একাধিক মানদণ্ডে। পাশাপাশি সারা বাংলাদেশে স্পেনের সিমাগো ইনস্টিটিউশন র্যাংকিং-২০২২ এ রসায়নে প্রথম হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়টি ইউজিসির বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি, টাইমড হায়ার এডুকেশনসহ দেশি-বিদেশি সব জার্নাল এবং গবেষণায় জায়গা করে নিয়েছে।
জগন্নাথের অবদান : বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই প্রতিষ্ঠানটি কলেজ আমল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাস আঙিনায় ইতোমধ্যে সুনাম ছড়িয়েছে সারা দেশে। বিসিএস, ব্যাংক, বিমা, জুডিশিয়ারি, আইনজীবী, এসআই, সার্জেন্ট, কর্পোরেট, মাল্টি-ন্যাশনালসহ সর্বস্তরে ভালো করছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনেকেরই বলিষ্ঠ উপস্থিতি এই আন্দোলনে গতি সঞ্চার করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যা যা আছে : বিশ্ববিদ্যালয়টি ১১.১১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে সাড়ে সাত একর জায়গায় অবস্থিত। যার মধ্যে একটি প্রশাসনিক ভবন, কলা, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, সামাজিক বিজ্ঞান ভবনসহ মোট নয়টি ভবন রয়েছে। একটি শহীদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক গুচ্ছ ভাস্কর্য, ‘একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে আটটি অনুষদ, ৩৮টি বিভাগ ও দুইটি ইনস্টিটিউট। এ ছাড়াও নতুন তিনটি বিভাগ এবং একটি অনুষদ চালু করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৭ হাজার ৬২৩ জন ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত আছেন। প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ৬৮০ জন শিক্ষক রয়েছেন। এ ছাড়াও ২৩৮ জন কর্মকর্তা ও ৩৩৩ জন কর্মচারী, ১৭৫ জন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং ২০৪ জন বিভিন্ন পেশায় দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মী নিয়োজিত আছেন। প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠটির প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে নতুন সাততলা ভবনের ছয়তলায় অবস্থিত একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এবং ভিন্ন ভিন্ন দুটি উন্মুক্ত গ্রন্থাগার রয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা ৩১ হাজার ৩২৬টি। গ্রন্থাগারে ইন্টারনেট সুবিধাসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি বইয়ের সমাহার বিস্তৃত। বর্তমানে ছাত্রীদের আবাসিক সমস্যা নিরসনে ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ নামের একটি ১৬তলা বিশিষ্ট এক হাজার ২০০ আসনের একটি হল রয়েছে।
আধুনিক সুবিধা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন : অনাবাসিক খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত যাতায়াতে নিজস্ব সিলভার রঙের একতলা ও দ্বিতলা বাস, মাইক্রোবাস, বিআরটিসির ভাড়ায় চালিত লাল রঙের দ্বিতল বাসসহ মোট ৫৭টি বাস রয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ধূপখোলা, কেন্দ্রীয় মিলনায়তন, নিজস্ব একটি মেডিকেল সেন্টার, কাউন্সেলিং সেন্টার, শরীরচর্চা শিক্ষা কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য দুটি আলাদা আধুনিক ক্যাফেটেরিয়া, ছাত্র-ছাত্রীর জন্য পৃথকভাবে নামাজ পড়ার একটি দ্বিতল বিশিষ্ট মসজিদসহ মিডিয়া, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক ২০টির অধিক সংগঠনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে ছোট্ট এই ক্যাম্পাসটিতে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস : শিক্ষার্থীদের হল আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অনাবাসিক সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপন প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০০ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে আধুনিক মানসম্মত এই ক্যাম্পাসটি। প্রকল্পটির মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কথা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ সাল নাগাদ। যদিও ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রথম প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী।
উপাচার্যের বক্তব্য : সার্বিক বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, আবাসন সমস্যা দূরীকরণে আমরা চেষ্টা করছি। স্বল্প পরিসরে হলেও আবাসন শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চীন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দ্রুতাবাস ও দেশি-বিদেশি সংগঠনের পজিটিভ সাড়া পাচ্ছি। উপাচার্য আরও বলেন, আমাদের প্রশাসন এখন অনেক গতিশীল। কোনো ধরনের স্থবিরতা নেই এখানে। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আধুনিক ফুডকোট ও শিক্ষা উপকরণ সেবা পেতে শিগগিরই নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্লাস এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য একটি অ্যাপস চালু করছি। যা আগামী দুই মাসে হয়ে যাবে বলে আশা করি। গবেষণার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সব সুবিধা পাবে। সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।