আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘স্বল্প’ পরিসরে ‘প্রক্সি ভোটিং’ ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য অংশীজন রাজি থাকলে এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। গতকাল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তিনটি পদ্ধতির মধ্যে ‘প্রক্সি ভোট’ নিয়ে এপ্রিলের শুরুতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। এরপর বসা হবে রাজনৈতিক দলসহ অন্য অংশীজনদের সঙ্গে। সবার সম্মতি পেলে এবং সিস্টেম ডেভেলপ করা সম্ভব হলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ছোট পরিসরে চালু করা হবে প্রক্সি ভোট। পোস্টাল ব্যালট ও অনলাইন পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রক্সি ভোটের সুপারিশ করেছে ইসি সচিবালয়ের এ-সংক্রান্ত কমিটিও। প্রক্সি ভোট সম্পর্কে ইসি বলছে, এ পদ্ধতিতে প্রবাসী বাংলাদেশির হয়ে দেশে অবস্থানরত একজন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় ভোট দেবেন। এ-সংক্রান্ত কমিটি বলছে, প্রক্সি ভোটিংয়ে তাদের কাছে বিবেচ্য হলো পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ও ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা।
প্রক্সি ভোটের বিষয়ে সোমবার একটি ‘প্রেজেন্টেশনও’ হয়। এ ছাড়া এ বিষয়ে কর্মশালা করার বিষয়ে কমিশন অনুমোদন দিয়েছে। প্রক্সি ভোটের বিষয়ে ইসির অবস্থান তুলে ধরে সানাউল্লাহ বলেন, প্রক্সি ভোটই একমাত্র পদ্ধতি, যেটা ন্যূনতম সময়ের মধ্যে করা সম্ভব। তিনটি পদ্ধতি নিয়ে একটা ওয়ার্কশপ হবে ৭ থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, এমআইএসটি, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিটির বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। তিনি বলেন, মধ্য এপ্রিলের মধ্যে তিনটির পদ্ধতির একটি আর্কিটেকচার ডেভেলপ হয়ে গেলে তারপরই অংশীজনের সঙ্গে বসবে ইসি।
পোস্টাল ব্যালট অচল : বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পোস্টাল ব্যালট কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন এ নির্বাচন কমিশনার। আমাদের কমিটির ফাইন্ডিং হচ্ছে, বর্তমানে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট একটি অচল পদ্ধতি। ব্যালট পেপার ছাপানোর পর ভোটের ১০-১২ দিন সময় থাকে।
প্রবাসীদের ভোট পোস্টাল ব্যালটে করতে গেলে ২৪ থেকে ৪০ দিন সময় লাগে। তাই এটা চলবে না, বিকল্প বের করতে হবে। তিনি বলেন, গত নির্বাচনে দেখেছি, এ পদ্ধতিতে প্রবাসীদের একটি ভোটও পড়েনি। দেশে পড়েছে ৪৩৩টি।
কী সুপারিশ, কেন প্রক্সি ভোট : এ নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ইসির একটি কমিটি রয়েছে। এ ছাড়া ইসি সচিবালয়ের আইসিটি ও প্রবাসী শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে আরেকটি কমিটি রয়েছে, যারা প্রবাসীদের বিষয়ে ভোট পদ্ধতির সুপারিশ করবে।
সানাউল্লাহ বলেন, ‘কমিটি তিন পদ্ধতির মধ্যে প্রথম দুটি (পোস্টাল ব্যালট ও অনলাইন) ট্রায়ালের জন্য সাজেস্ট করেছে। এরপর পরীক্ষা করে দেখা যায় কোনটি বাস্তবায়ন সহজ। আর আগামী নির্বাচনের জন্য তারা সাজেস্ট করেছে, যদি সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হয় এবং প্রধান উপদেষ্টা যেভাবে বলেছেন, সেভাবে প্রবাসীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই, তাহলে আমাদের প্রক্সি ভোটিংয়ে যেতে হবে।’
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, প্রক্সি ভোটের পক্ষে কমিটির যুক্তি হচ্ছে- বিশ্বে বিভিন্ন জায়গায় এটি প্রচলিত, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমিজমা বিক্রির মতো ভোটের অধিকারেও তা বাস্তবায়নযোগ্য। দেশে বর্তমানে আরেকজনের সহায়তা নিয়ে ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে, বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধী ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে; একজনের হয়ে আরেকজন ভোট দিয়ে দেয়। কমিটি এটিকে সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি বলে সুপারিশ করেছে।
যেভাবে প্রক্সি ভোট : ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে। এনআইডি নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অ্যাপ ডেভেলপ করবে ইসি। নিবন্ধনের পর নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে সব করবে, কোনো দূতাবাসেরও সহযোগিতা লাগবে না। সরাসরি ভোটার টু ইলেকশন কমিশন। বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হবে।
ইসি কর্মকর্তারা বলেছেন, এ পদ্ধতিতে প্রবাসী যারা ভোট দিতে চান, তারা প্রথমে একটা অ্যাপে ফেইস রিকগনিশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করবেন। প্রি-রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভোটের আগ্রহ প্রকাশ করবেন। ওই রেজিস্ট্রেশনের সময় তার পক্ষে যিনি ভোট দেবেন, তার এনআইডি ও বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার সময় জানিয়ে দেবে, কারা কারা প্রক্সি ভোট দেবেন। তাদের জন্য আলাদা ভোটার তালিকার প্রয়োজন পড়বে না। আবদুল মমিন সরকার বলেন, যিনি প্রক্সি ভোট দেবেন, তিনি নিজেও ভোটও দিতে পারবেন। এটা ওয়ান কাইন্ড অব পাওয়ার অব অ্যাটর্নি। প্রবাসীরা বিদেশে বসে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন এবং উনার পক্ষে একজনকে (তার নির্বাচনি এলাকার) নির্ধারণ করে দিতে পারবেন প্রক্সি ভোটার হিসেবে। এটার একটা অথেনটিকেশন করে দেওয়া হবে, যাতে এলোমেলোভাবে কেউ এটার সুযোগ না নিতে পারে।