সৌদি আরবে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে বাংলাদেশের স্বপ্নবাজ নারীদের। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে গৃহকর্মীর ভিসায় গত এক দশকে সৌদিতে পাড়ি দিয়েছেন ৫ লাখের অধিক নারী। কিন্তু তাদের বেশির ভাগেরই ভাগ্যের পরিবর্তন তো হয়নি, উল্টো কপালে জুটছে যৌন ও শারীরিক নির্যাতন। সৌদি নাগরিকদের নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন হতভাগ্যের কেউ কেউ।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহকারী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ‘উন্নত জীবনের আশায় গত এক দশকে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছেন ৫ লাখের বেশি নারী, যাদের সিংহভাগই গেছেন গৃহকর্মীর ভিসায়। ভাগ্যের সন্ধানে যাওয়া এসব নারী পদে পদে শিকার হন বঞ্চনার। শারীরিক এবং যৌন নির্যাতন সেখানে সাধারণ ঘটনা। টানা কাজ করার পরও ঠিকভাবে বেতন পান না নারীদের কেউ কেউ।’ জানা গেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে জীবিকার তাগিদে পাড়ি দিয়েছেন ৫ লাখের বেশি নারী। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ২০ হাজার ৮৫২ জন, ২০১৬ সালে ৬৮ হাজার ২৮৬ জন, ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন, ২০১৮ সালে ৭৩ হাজার ৭১৩ জন, ২০১৯ সালে ৬২ হাজার ৫৭৮ জন, ২০২০ সালে ১২ হাজার ৭৩৫ জন, ২০২১ সালে ৫৩ হাজার ৮২ জন, ২০২২ সালে ৭০ হাজার ২৭৯ জন, ২০২৩ সালে ৫০ হাজার ২৫৪ জন এবং ২০২৪ সালে ৪০ হাজার ৩১৫ জন নারী যান সৌদি আরবে। তাদের সিংহভাগই গেছেন গৃহকর্মীর ভিসায়। সৌদিতে যাওয়া নারীদের মধ্যে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন কমপক্ষে ১৫ হাজার নারী। এ পর্যন্ত নির্যাতন, আত্মহত্যাসহ নানান কারণে সৌদি আরবে মারা গেছেন কমপক্ষে ৫০০ নারী। উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র নারীকে গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি নিতে আকৃষ্ট করে মানব পাচারকারী রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র। গৃহকর্মীর ভিসায় নিয়ে যাওয়ার পর কয়েক হাত ঘুরে তিন-চারবার সৌদি আরবে বিক্রি করা হয় বাংলাদেশি এইসব নারী শ্রমিকদের। নারীদের এজেন্সি থেকে কফিল, কফিল থেকে আবারও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় সৌদি নাগরিকদের কাছে বিক্রি করার পর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। তাদের ওপর চালানো হয় যৌন এবং শারীরিক নির্যাতন। সমান তালে চলে মানসিক নির্যাতন। দেওয়া হয় না বেতন। বেতন চাইলেও চলে অমানবিক নির্যাতন। এমনকী কাউকে কাউকে কারাগারে পাঠানোর নজিরও রয়েছে।
কঠোর সৌদি আইনের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি বাংলাদেশি কমিউনিটির কোনো নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কমিউনিটি নেতা বলেন, ‘বেশির ভাগ সৌদি নাগরিকের আচরণ রূঢ়। তাই কোনো দেশই সৌদিতে গৃহকর্মী হিসেবে নারীদের পাঠাতে খুব একটা রাজি হয় না। কিন্তু বাংলাদেশি নারীদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এখানে আনা হয়। কাজে যোগদানের পর শুরু হয় শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে তারা ভাষাগত সমস্যার কারণে আইনি প্রতিকার পায় না পুলিশের কাছে। রিক্রুটিং এজেন্সিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া ও নিয়োগকর্তা সৌদি নাগরিকদের কোনো জবাবদিহি না থাকায়, দেশটিতে বাংলাদেশি নারীদের ওপর নির্যাতন বেড়েই চলছে।’