সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা রয়েছে উপদেষ্টাসহ সব মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সচিবসহ সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। তবে এখনো অনেক হেভিওয়েট এই আয় ব্যয় ও সম্পদের হিসেব জমা দেননি। তিন দফায় সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়েছে সরকার। এরপরও এ পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব জমা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ অনেক সচিব সম্পদ বিবরণী জমা দিলেও এখনো বাকি রয়েছে অনেকের। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সচিব ও দপ্তর/সংস্থার প্রধান ব্যক্তিরা হিসাব জমা দেননি। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে প্রধান উপদেষ্টার কাছে। যা সংরক্ষিত থাকবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। অবশ্য তৃতীয় দফা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর ফলে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যেহেতু ট্যাক্স রিটার্নের সঙ্গে সম্পদের হিসাবটা জড়িত, সে কারণে ট্যাক্স রিটার্নের সময় বেড়েছে।
এ কারণেই এটি অনেকের কাছ থেকে এখনো পাওয়া যায়নি। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্য উপদেষ্টারাও হিসাব জমা দেবেন। জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব জমা দিতে গত ১ অক্টোবর একটি নীতিমালা প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই নীতিমালায় বলা হয়, আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাঁদের আয় ও সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে। উপদেষ্টা বা সমমর্যাদার ব্যক্তিদের স্ত্রী বা স্বামীদের পৃথক আয় থাকলেও সেটিও জানাতে হবে। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ‘আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন।’ নীতিমালায় আয় ও সম্পদের তথ্য বিবরণী জমা দিতে একটি ছকও তাঁদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। তারপরও উপদেষ্টাসহ অনেক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সিনিয়র সচিবরা এখনো সম্পদের হিসাব জমা দেননি। তবে তাঁরা হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করছেন বলেও জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পরপরই ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন নিজের সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। গত ২২ ডিসেম্বর দুদক চেয়ারম্যান গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বলেন, ‘আমাদের কমিশনের সবাই সম্পদের হিসাব জমা দেবে।’ সে সময় তিনি নিজের সম্পদের কিছু বিবরণ তুলে ধরেন। ২০২৪-২৫ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় ৩১ ডিসেম্বর থাকলেও তা এক মাস বাড়িয়ে চলতি মাসের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে সব রিটার্ন জমা না হওয়ায় সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার সময় আরও ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে। সে হিসেবে ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখের মধ্যে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে উপদেষ্টা, সিনিয়র সচিব, সচিবসহ সব সরকারি কর্মচারীকে। যদি আয়কর রিটার্নের সময় না বাড়ত তবে চলতি মাসের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে উপদেষ্টাদের হিসাব জমা দিতে হতো। মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন সূত্রগুলো জানায় এ পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব জমা হয়েছে। সরকারের উপদেষ্টা আছেন ২২ জন। উপদেষ্টা পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী/বিশেষ দূত আছেন তিনজন। আর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) আছেন তিনজন। তবে এখনো কাদের সম্পদের হিসাব জমা হয়নি, সেটি জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে মন্ত্রিপরিষদের একাধিক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, নীতিমালায় বলা আছে, আয়কর রিটার্নের পরও ১৫ দিন সময় পাবেন তাঁরা। যেহেতু আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় বেড়েছে, তাই অনেকে সময় নিচ্ছেন বা দেরি হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবাই হিসাব দেবে বলে জানান তাঁরা। জানা যায়, উপদেষ্টাদের মতো সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে সরকারের কাছে। এর মধ্যে ক্যাডার কর্মকর্তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হিসাব জমা দিচ্ছেন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা নিজ নিজ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাব বিবরণী জমা দিচ্ছেন। জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোখলেস উর রহমান সব সরকারি কর্মচারীকে প্রতি অর্থবছরের সম্পদ বিবরণী ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে দাখিল করতে বলেন। সম্পদ বিবরণী জমা না দিলে এবং তথ্য গোপন করলে শাস্তি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এর আগে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে বলা হয়েছিল। পরে সে সময় বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় দফায় গত ২৬ ডিসেম্বর আবারও হিসাব জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেরি করার একটা অন্যতম কারণ অনভ্যস্ততার একটি বিষয়। অনেকের মধ্যে অলসতা কাজ করে। তবে সিনিয়র কর্মকর্তারা আগেভাগে দিলে নিচের দিকে অনুপ্রাণিত হয়।