সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আনতে ও নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির সুবিধার জন্য সব সরকারি দপ্তরকে ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এজন্য সব দপ্তরের জন্য বিপুল বাজেটে তৈরি করা হয়েছে ওয়েবসাইট। তবে তথ্য প্রকাশে অনীহা অধিকাংশ সরকারি দপ্তরের। এসব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না হালনাগাদ তথ্য।
দরপত্র ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তথ্য ওয়েবসাইটে থাকে না। অনেক ওয়েবসাইট দুই বছরেও হালনাগাদ করা হয়নি। দুবার কর্মকর্তা পরিবর্তনের পরও ওয়েবসাইটে রয়ে গেছে আগের কর্মকর্তার নাম। ভুলে ভরা বানান। বছর ঘুরলেও প্রকাশ করা হয় না বার্ষিক বা ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন। ওয়েবসাইটে দেওয়া সরকারি নম্বরে পাওয়া যায় না কর্মকর্তাদের। বিভিন্ন সেবার জন্য অনলাইনে ফরম পূরণ করতে গেলেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় নাগরিকদের। তথ্যসেবা প্রার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দপ্তরের ওয়েবসাইট ঘেঁটে সরকারের তথ্যসেবার এমন নাজুক অবস্থা দেখা গেছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করলে কেউ জনবল সংকটের দোহাই দিয়েছেন, কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি, কেউ এক ঘণ্টা পরে ফোন দিতে বলে আর ফোন ধরেননি।
গতকাল সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের (https://ecs.portal.gov.bd/) ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে নাম রয়েছে মো. আবদুল বাতেনের। তবে তিনি এই দপ্তরে শেষ অফিস করেছেন ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী। তিনি ওই বছরের ২ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের পর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন এস এম আসাদুজ্জামান। ওয়েবসাইটের ওই পাতাটি ২০২২ সালের ৩০ মার্চের পর তিন বছরে আর হালনাগাদ করা হয়নি।
জন্মনিবন্ধন ফরম পূরণ করতে গিয়েও অনেককে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এক ভুক্তভোগী জানান, অনলাইনে জন্মনিবন্ধন ফরম পূরণ করতে গেলে মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জায়গায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ার্ড-৪ লেখা আসে। অর্থাৎ, সংখ্যাটি ইংরেজিতে, বাকি সব বাংলায়। এটা বিভ্রান্তিকর।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটে দেওয়া কর্মকর্তাদের সরকারি নম্বর অনেক আগে থেকেই বন্ধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলেও পরিবেশ অধিদপ্তরে সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনটি ২০২২-২৩ অর্থবছরের। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে লাইভ বায়ুমান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখলেও ছুটির দিনে ওয়েবপেজটিতে প্রবেশ করা যায় না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটটিতে আট মাস পার হলেও ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনবল সংকটের কথা বলেন পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক আবদুস সাত্তার। গ্রাহকবান্ধব না হওয়ায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইটে বিভিন্ন প্রতিবেদন খুঁজে পেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। ওয়েবসাইটটিতে ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ তৃতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে, যখন চতুর্থ প্রান্তিকের প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা। মার্চ শেষের পথে থাকলেও চতুর্থ প্রান্তিকের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি বিবিএস-এর ওয়েবসাইটে। বিলম্বে প্রকাশ করায় প্রয়োজনীয়তা হারাচ্ছে এসব প্রতিবেদন।
সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর কারিগরি ত্রুটিও বড় একটি সমস্যা। বেশির ভাগ সাইট ব্যবহারকারীবান্ধব নয়, ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক লিংক কাজ করে না বা ‘’Error 404’’ দেখায়। মোবাইল থেকে ব্রাউজ করতে গেলে সাইটের ডিজাইন ভেঙে যায়। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ওয়েবসাইট তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণ ও আপডেটের জন্য নির্দিষ্ট জনবল নেই। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রশিক্ষিত জনবল থাকলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।