চীন, ভারত, পাকিস্তান কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার কোনো ভোক্তার কাছে তার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। এজন্য কোনো ব্যাংকে এলসি খুলতে হবে না, লাগবে না কোনো ডকুমেন্ট। কোনো এজেন্ট ছাড়াই সরাসরি ভোক্তার কাছ থেকে গ্রাহকের অনলাইনে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ অবারিত করতে দেশে প্রথমবারের মতো ক্রস বর্ডার (আন্তঃসীমান্ত) ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নীতিমালার খসড়াটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীনকে দেখানো হয়েছে। তিনি এটি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করার বিষয়ে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। শিগগিরই নীতিমালাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হবে।
কেন এ নীতিমালা : ছোট ছোট উদ্যোক্তা বাংলাদেশের কোনো পণ্য বা সবজি বা ফলমূল যদি বিদেশে রপ্তানি করতে চাইলে তা লাগেজ পার্টির মাধ্যমে পাঠান। এ ধরনের বাণিজ্যের বিপরীতে যে পেমেন্ট হয়, তা ব্যাংকিং সিস্টেমে আসে না। হুন্ডি বা অন্য কোনো মাধ্যমে আসে। একইভাবে ক্রস বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা না থাকায় বাংলাদেশের ভোক্তারা আমাজন, আলিবাবার মতো ইকমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পণ্য আনতে পেমেন্ট সমস্যায় পড়েন। এ সমস্যা সমাধানে নীতিমালাটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চীন বাংলাদশ থেকে আম, কাঁঠাল, পেয়ারাজাতীয় ফল নেওয়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। এলসি করে এ ধরনের ছোট অ্যালটম্যান্টের পণ্য রপ্তানি করা কঠিন। যদি এ নীতিমালাটি অনুমোদন হয়, তখন বাংলাদেশের ভোক্তারা নিজের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে রপ্তানি করতে পারবেন। এজন্য কোনো এলসি করতে হবে না। ধরা যাক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো বাগান মালিক তার আমের ছবি অনলাইনে প্রদর্শন করলেন। ওই ছবি দেখে চীনের কোনো ভোক্তা সরাসরি অর্ডার দিতে পারবেন। এর ফলে উদ্যোক্তার সঙ্গে ক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি হবে।
যেভাবে পেমেন্ট হবে : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানি করার জন্য বিদেশি কোনো ভোক্তা যখন অনলাইনে অর্ডার দেবেন, তখন ওই পণ্যের দামের সঙ্গে প্রচলিত কর যুক্ত হয়ে যে পেমেন্ট দেখাবে, ক্রেতা সেটি পরিশোধ করবেন। ওই অর্থ পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকবে। উদ্যোক্তার সরবরাহকৃত পণ্য যখন ভোক্তা হাতে পাবেন, তখন একটি কোড পৌঁছাবে পেমেন্ট গেটওয়েতে। এরপর পেমেন্ট গেটওয়ে ওই অর্থ থেকে উদ্যোক্তা বা রপ্তানিকারকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পণ্যের দাম স্থানান্তর করবে। আর করের অর্থ চলে যাবে সরকারি কোষাগারে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব আয় করবে তেমনি ব্যাংকিং চ্যানেলে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় রপ্তানির করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার প্রচলিত প্রণোদনা সুবিধাও পাবেন দেশের উদ্যোক্তারা। এ নীতিমালা হলে ঋণপত্র (এলসি) খোলা ছাড়াই দেশে বসে যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্য ও সেবা আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন। আমাজন, আলিবাবা, বেস্টবাইসহ বিশ্বজুড়ে থাকা সব ধরনের বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অনলাইনে খুচরা ও বাল্ক আকারে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে।
নীতিমালায় যা আছে : খসড়ায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিজনেস-টু-কনজ্যুমার (বিটুসি) এবং কনজ্যুমার-টু-কনজ্যুমার (সিটুসি) সীমান্ত বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ছে। বিশ্ববাণিজ্যের পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশকেও এ ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ৭৮ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ৬৩ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে এ দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে নকল বা ভেজাল পণ্য এবং কল্পিত বা ধারণাগত পণ্য কেনাবেচা করা যাবে না। অনলাইন লটারি, জুয়া, বেটিং, গেমিং ইত্যাদি আয়োজন করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো গিফট কার্ড, গিফট ভাউচার বা অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে- এমন কোনো কার্ড বা ডিজিটাল নম্বর বা মাধ্যম কেনাবেচা করতে পারবে না।