মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই ভাষণে তিনি আবারও বলেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এটি কোনো নতুন কথা নয়। এর আগেও প্রধান উপদেষ্টা বিভিন্ন ফোরামে ও সাক্ষাৎকারে বারবার বলেছিলেন, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চান। এই নির্বাচন পেছাবে না। অনেকে আশা করেছিলেন যে, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি নির্বাচনের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন। কিন্তু সেটি করা হয়নি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বাস্তবতা হলো এখন বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি তাতে দ্রুত একটি নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন যত পেছাবে, তত সংঘাত, সহিংসতা, জটিলতা বাড়বে। দেশে অস্থিরতা দেখা দেবে এবং জনমনে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব প্রতিষ্ঠিত হবে। নির্বাচন পেছানো মানেই ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিস্তার। এরকম পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। আট মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকার নানা রকম জটিল এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সময় যত যাচ্ছে পরিস্থিতি তত জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এই যেমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথাই ধরা যাক। গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যতবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিছুটা উন্নতি হওয়ার পর আবার একটি আচমকা ঘটনা ঘটে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কোনো সুখবর নেই। কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। এর একটি বড় কারণ পুলিশ বাহিনী এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। তারা পূর্ণ আস্থা এবং মনোবল নিয়ে মাঠে কাজ করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তাদের আস্থায় নিয়ে মাঠে নামানো এখন প্রায় অসম্ভব। কারণ একটি অন্তর্বর্তী সরকার সবসময় ক্ষণস্থায়ী। এটির নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। কিন্তু যদি একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে তাদের একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের সময়সীমা থাকবে। সবাই জানবে তাদের নীতি এবং পদ্ধতি কী হবে। সে অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী বা অন্য সবাই কাজ করবে। এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রয়োজন একটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।
আমরা দেখেছি, ৫ আগস্টের পর দেশের প্রচুর থানা লুট হয়েছে। অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গেছে কিছু দুর্বৃত্ত। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, গত সাড়ে সাত মাসে অস্ত্র উদ্ধারে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি, বরং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বারবার এনিয়ে কথা বলেছেন। আবার কদিন পরেই অস্ত্র উদ্ধারের আয়োজন ঝিমিয়ে গেছে। বিপুল অবৈধ অস্ত্র দেশে। এই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক চিহ্নিত সন্ত্রাসী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এখন সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত। আমরা দেখছি যে, গত সাড়ে সাত মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি এবং বিভাজন বেড়েই চলেছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক দূরত্ব বেড়েছে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে বিএনপির আদর্শিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য। তারা কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। এর চেয়েও আতঙ্কের বিষয় হলো বিভিন্ন স্থানে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সামনের দিনগুলোতে এই সহিংসতা বাড়বে। সে ধরনের সহিংসতা যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদি একটি সংকটের দিকে যাবে। তাই সংকট মোকাবিলার জন্য দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো দিয়েছে সেই সংস্কার প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এটা নিয়ে আলোচনা করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হবে সেটুকু নিয়েই তারা এগোতে চান। তাই যদি হয়, তাহলে এসব সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যে মতামত এসেছে, সেই মতামতের ভিত্তিতে এখন নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা উচিত। কারণ সব জায়গায় একটা অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পুরোপুরি রেমিট্যান্সনির্ভর। বিদেশি বিনিয়োগ উদ্বেগজনকভাবে কম। আমরা যতই তথ্য-উপাত্ত দিই না কেন, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এরকম একটি অবস্থার কারণে সারা দেশের কর্মকাণ্ড যেন স্থবির হয়ে গেছে। এ কথা ঠিক যে, রমজান মাসে অন্তর্বর্তী সরকার পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। অনেক পণ্যমূল্য গতবারের তুলনায় কম ছিল। কিন্তু এটি হলো একটি আপৎকালীন ব্যবস্থা। বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক কর কমিয়ে কৃত্রিমভাবে দাম কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে তা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। আর এ কারণেই এ সরকারের যে কর্মপরিধি এবং কার্যক্রম সেটি নিয়ে মানুষের মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচল তৈরি হয়েছে। তাছাড়া জুলাই বিপ্লবের বেশ কয়েকটি নেতিবাচক দিক প্রকাশ হয়েছে। প্রথমত, জুলাই বিপ্লবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই ছাত্রদের ব্যাপারে অনেক রকম কথা হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির অর্থের উৎস এবং তাদের নেতা-কর্মীদের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের সময় যত পেছাবে, তত এসব বিষয় প্রকাশ হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি মূলত বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত। আর এ কারণেই হঠাৎ করে তাদের আর্থিক স্ফীতি, তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ইত্যাদি মানুষের চোখে দৃষ্টিকটুভাবে লাগছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির একজন নেতা পঞ্চগড় গেছেন শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে। খোদ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চোখ এতে কপালে উঠেছে। হঠাৎ করে দৃষ্টিকুটুভাবে এ ধরনের শোডাউন রাজনীতির মাঠে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। শুধু একজনের ভুলের কারণে পুরো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আদর্শ এবং সততা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। নায়ক থেকে তারা ভিলেনে রূপান্তরিত হচ্ছেন। কাজেই দ্রুত নির্বাচন দিয়ে এই বিপ্লবকে সুরক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটানো হয়েছিল। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই সাবেক স্বৈরাচার আবার নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম হচ্ছে। তারা জনগণের মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নানা রকম অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তি। দিন যত বাড়বে ততই তারা পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পাবে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল, শুরুতেই সেই আন্দোলন মুখথুবড়ে পড়েছে। অধিকাংশ মানুষ এখন এসবের মধ্যে যেতে চায় না। তারা একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একমাত্র পথ একটি নির্বাচিত সরকার।
তৃতীয়ত, এই সাড়ে সাত মাসে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে শুরু হয়েছে নোংরা খেলা। একটি মহল আমাদের জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টায় লিপ্ত। এই ষড়যন্ত্র দেশে বড় সংকট সৃষ্টি করবে। সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ডিউটি করছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়। সশস্ত্র বাহিনীকে বিতর্কমুক্ত করতে প্রয়োজন দ্রুত নির্বাচন। নির্বাচন করে সশস্ত্র বাহিনীক ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে নিলেই এই বিতর্কের অবসান হবে।
আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি আপৎকালীন ব্যবস্থা। একটি সাময়িক ব্যবস্থাপত্র। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘদিন একটি পরিবার, একটি সমাজ বা রাষ্ট্র চলতে পারে না। নানারকম ষড়যন্ত্র করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। যার ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাচ্ছি। একদিকে যেমন দেশে মানুষ অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা রাখতে পারে না, অন্যদিকে বিদেশিরাও একটা স্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি হয় না। এ কারণেই এখন আমাদের সামনে একটাই পথ খোলা। তা হলো দ্রুত নির্বাচন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। নির্বাচনে যারাই জিতুক না কেন তারা জুলাই বিপ্লবের আদর্শ সামনে রাখবেন। সেই অনুযায়ী তারা কাজ করবেন। রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার হয়েছিল, সেই অঙ্গীকারগুলো তারা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কাজ করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো- যারা জুলাই-আগস্টে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, বিভিন্ন সময়ে লুণ্ঠন, অপরাধ করেছেন, তাদের দ্রুত বিচার করার ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কিন্তু আমরা যদি নির্বাচনকে বিলম্বিত করি তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন বিভক্তি দেখা দেবে, তেমনি জনগণের মধ্যে দেখা দেবে হতাশা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ মুখথুবড়ে পড়বে।