আলোচিত জনপ্রশাসন কমিশনের রিপোর্টের দিকে এখন দৃষ্টি সব ক্যাডার কর্মকর্তার। শুধু ক্যাডার কর্মকর্তারা নন, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও খোঁজখবর নিচ্ছেন কী থাকতে পারে রিপোর্টে। রিপোর্ট প্রকাশিত হলে আন্তক্যাডার সংকট আরও বাড়বে না কমবে, সেসব বিষয় নিয়ে হচ্ছে নানা আলোচনা। কমিশনের রিপোর্টও তৈরি শেষের দিকে, যা ১৫ জানুয়ারি জমা দেবে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী, ক্যাডার সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার সেপ্টেম্বরে কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে দেয়। ৩১ ডিসেম্বর কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা থাকলেও কাজ অসমাপ্ত থাকায় সরকার আরও ১৫ দিন সময় বাড়িয়েছে। কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। আশা করছি বাকি কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হবে।’
কমিশনের আরও একাধিক সদ্যস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করলে একজন নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘নাগরিক সেবা এবং মেধা এ দুটো বিষয়কে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমলাতন্ত্রে মানুষ যেন হয়রানি না হয়, সবাই সহজ সেবা পায় সে বিষয়ে সুপারিশ থাকবে।’ আরেক সদস্য বলেছেন, ‘চাকরিজীবীদের মধ্যে যে বৈষম্যের কথা বলা হয় সেখানে ন্যায়বিচার থাকবে। মেধার প্রাধান্য থাকবে। টপ পর্যায়ে পদগুলোতে যেন ব্রিলিয়ান্টরা থাকে সে সুপারিশ থাকবে।’ এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা বা আরও মডার্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে মেধাবীদের আনার সুপারিশ থাকবে জানান তিনি। পিএসসি থেকে সকল পর্যায়ে মেধার গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেন ওই সদস্য। সুপারিশ বিষয়ে আরেক সদস্য বলেন, ‘জনপ্রশাসন আরও জনবান্ধব করা, জবাবদিহি বাড়ানো, নিরপেক্ষ হওয়ার প্রস্তাব থাকবে।’
গত মাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী কিছু খসড়া প্রস্তাব প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় নানামুখী সমালোচনা। সব ক্যাডার কর্মকর্তার মধ্যে শুরু হয় অস্থিরতা। সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী উপসচিব পদোন্নতিতে প্রশাসন ৭৫ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ২৫ শতাংশ দেওয়া হতো। সেটি লঙ্ঘন করে ৫০ঃ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব সামনে আসার পর প্রশাসন ক্যাডারের সব কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বাসা) এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সহকারী কমিশনার (শুরুর পদ) থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত পদগুলোর সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠা করার দাবি তুলেছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডার নিয়ে পৃথক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করার উদ্যোগ নিচ্ছে এমন খবরে প্রচ ক্ষুব্ধ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডার কর্মকর্তারা। এতদিন ২৫ শতাংশ কোটা পেয়ে খুশি থাকলেও এবার মেধার ভিত্তিতে শতভাগ দাবি করে কমিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কলমবিরতি-মানববন্ধন করে সরাসরি আন্দোলনে নামেন প্রশাসন বাদে ২৫ ক্যাডার কর্মকর্তারাও। এমন অস্থিরতার মধ্যে কমিশন জানায়, খসড়া সুপারিশ সংশোধন করার সুযোগ আছে। তবে সেই সংশোধনে কী থাকছে সেদিকে চোখ রাখছেন সব ক্যাডারের কর্মকর্তা। প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁদের নিজেদের পদ অন্যদের কেন ছেড়ে দেবেন সে প্রশ্ন তুলেছেন। বাকি ক্যাডাররা পছন্দ করে নিজ নিজ পেশায় এলেও এখন সবাই প্রশাসনে আসতে মরিয়া। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র, পুলিশ ক্যাডার অনেকটাই নীরব দর্শকের ভূমিকায় আছে। অনেকটা আন্তক্যাডার দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে এ সংস্কারের আদলে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা মনে করছেন, কমিশনের উপযুক্ত রিপোর্টই এসব দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে। গত কয়েকদিন সচিবালয়সহ বাইরের অন্য দপ্তর/সংস্থায় বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা এ কমিশনের রিপোর্টের ওপর নজর রাখছেন। প্রশাসন ক্যাডারকে চেপে ধরা হচ্ছে কি না সে খবর রাখছেন প্রশাসন কর্মকর্তারা। আর অন্য ক্যাডাররা খোঁজ রাখছেন তাদের কী কী সুবিধার আওতা বাড়ছে সে বিষয়ে। কৃত্যভিত্তিক মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ যাচ্ছে কি না তারও খবর রাখছেন তাঁরা। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ, সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সব পক্ষের যৌক্তিক-অযৌক্তিক কথা আছে। এখানে কমিশনের রিপোর্ট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সরকার কতটুকু গ্রহণ করছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। উপদেষ্টাদের দিয়ে কমিটি হয়েছে তাদের কাজটাও গুরুত্বপূর্ণ, যা সামনে সরকারের সব কার্যক্রমে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’ সাবেক এ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রশাসন অনেক সময় অন্যদের পদোন্নতির মিটিং ঠিকমতো করে না, আবার অন্য ক্যাডার যে চাচ্ছে কৃত্য মন্ত্রণালয় সেটাও পৃথিবীর কোথাও নেই।’ প্রশাসন ক্যাডার ধ্বংস করে রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল করার দুরভিসন্ধি চলছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারদের সংগঠনের নেতারা। আর কৃষি, মৎস্য, খাদ্য ক্যাডার সংগঠনের একাধিক নেতা জানান, ‘মেধার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। আমাদের অনেক ক্ষেত্রে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। আমরা কেন বছরের পর বছর বঞ্চিত থাকব?’ বিভিন্ন ক্যাডারের সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে তাঁরা কমিশনের রিপোর্ট কী হচ্ছে সেটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তরের পর দেখে-বুঝে পরে নিজেদের কার্যক্রম বা মন্তব্য করবেন। এদিকে, ক্যাডারদের বাইরে ১০ থেকে ২০ গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করা না নিয়েও রয়েছে নানা ক্ষোভ এ শ্রেণির।