রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠকে হটটকে (উত্তপ্ত আলোচনা) বিশ্বজুড়ে তোলপাড় অবস্থা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত বৈঠকটি ১০ মিনিটের মধ্যে ভেস্তে যায় এবং জেলেনস্কিকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। এর জের ধরে ভেঙে গেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্ক। শুধু তাই-ই নয়, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজোটে পারস্পারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিভক্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এমন চলতে থাকলে বিশ্ব নতুন মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হতে পারে। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স।
খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে সম্পর্কের প্রকাশ্য ভাঙন- পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় মাপের সমস্যা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইউক্রেন ছাড়াও ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এখন আরও অনেক সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দেবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃশ্যত ট্রাম্পের যে তীব্র আগ্রহ, তার ভিত্তিতেই এসব উদ্বেগ জন্ম নিচ্ছে। ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বাগবিতণ্ডায় ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়টি নগণ্য হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে ইউরোপীয়রাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে হয়ে পড়ছেন উদ্বিগ্ন। একজন পর্যবেক্ষকের ভাষায়, প্রকাশ্য এ ঝগড়া ছিল একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ছিনতাই। এর উদ্দেশ্য, হয় জেলেনস্কিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছেমতো কাজ করতে বাধ্য করা, অথবা এমন একটি সংকট তৈরি করা, যাতে পরবর্তী সময়ে যা কিছু ঘটবে, তার জন্য জেলেনস্কিকে দোষারোপ করা যায়। ট্রাম্প যদি এ ঝগড়ার জেরে ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেন, তবু ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো, তারা এ যুদ্ধ কতটা কার্যকরভাবে ও কত দীর্ঘ সময় চালিয়ে যেতে পারবে?
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, একটা মিথ্যার ওপর রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে ইউক্রেন। অন্যদিকে এক্স পোস্টে জেলেনস্কি বলেছেন, ‘ধন্যবাদ আমেরিকা, ধন্যবাদ আমাদের সমর্থন করার জন্য, ধন্যবাদ আমাদের দেখে রাখার জন্য। ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং জনগণের প্রতি। ইউক্রেনের শান্তি দরকার। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।’
এ ছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এক্স পোস্টে বলেন, রাশিয়া অবৈধ এবং অন্যায়ভাবে ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেন সাহস এবং ধৈর্যের সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। তাদের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই লড়াই আমাদের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কানাডা সব সময় তার সঙ্গে রয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেন, ইউক্রেনের জনগণের থেকে আর কেউ অধিক শান্তি চাইতে পারে না। এজন্য আমরা একসঙ্গে ন্যায়সংগত শান্তির পথ খুঁজতে যুক্ত হয়েছি। এক্ষেত্রে ইউক্রেন জার্মান এবং ইউরোপের ওপর নির্ভর করতে পারে। পর্তুগালে সফররত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর হামলা চালিয়েছে, ফলে দেশটির জনগণ ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তিন বছর আগে ইউক্রেনকে সহযোগিতা করা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। যা এখনো চলছে। সুতরাং আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা এবং জাপানসহ যারা ইউক্রেনকে সহযোগিতা করেছে তাদেরকে অবশ্যই সস্মান করতে হবে। কারণ এসব দেশ ইউক্রেনের স্বাধীনতা, তাদের সম্মান এবং সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করছে। তিনি আরও বলেন, ‘এই সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মিত্রদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করা উচিত। ইউক্রেন নিয়ে যে সংকট শুরু হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। এ নিয়ে ইতালি দ্রুতই প্রস্তাব রাখবে।’
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র বলেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুক্তরাজ্য সব সময় পাশে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত কিয়েভের জন্য শান্তির পথ খুঁজে বের করতে আমরা পাশে রয়েছি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, আমরা যতদিন প্রয়োজন, ততদিন ইউক্রেনের পাশে থাকব। কারণ এটি একটি গণতান্ত্রিক জাতির লড়াই, যা একটি স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে লড়ছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, শক্তিশালী নেতারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন, দুর্বলরা যুদ্ধ বাধান। আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তির জন্য সাহসী অবস্থান নিয়েছেন। ধন্যবাদ, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোককে রাসমুসেন বলেন, এটি ইউক্রেনের জন্য কঠিন আঘাত। বন্ধুদের মধ্যে দৃঢ় আলোচনা হতে পারে, কিন্তু যখন তা ক্যামেরার সামনে ঘটে, তখন একমাত্র বিজয়ী হয় ক্রেমলিন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন জেলেনস্কিকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, আপনার মর্যাদা ইউক্রেনীয় জনগণের সাহসিকতার প্রতিফলন। আপনি কখনো একা নন, প্রিয় প্রেসিডেন্ট। মলদোভার প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু বলেন, সত্যটা খুব সহজ।
রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছে। ইউক্রেন তার স্বাধীনতা রক্ষা করছে এবং আমাদেরও। আমরা ইউক্রেনের পাশে আছি। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, প্রিয় জেলেনস্কি, প্রিয় ইউক্রেনীয় বন্ধুরা, আপনারা একা নন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, পশ্চিমাদের প্রতিটি বিভাজন আমাদের সবাইকে দুর্বল করে এবং তাদের সুবিধা বাড়ায়, যারা আমাদের সভ্যতার পতন দেখতে চায়। এই বিভাজন কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।