গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলার প্রতিবাদে গতকাল দিনভর শহরে বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে আলটিমেটাম ঘোষণা করা হয় সমাবেশে। এদিকে ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ ১৬ জনকে আটক করেছে। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার জন্য জিএমপির সদর থানার ওসি মো. আরিফুর রহমানকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এ কর্মসূচিতে যোগ দেন। জিএমপির সদর থানার ওসিকে সাসপেন্ড ও ১৬ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা নিশ্চিত করেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ড. নাজমুল করীম খান। গতকাল বিকালে শহরের রাজবাড়ী রোডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে গিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ তথ্য জানান। শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলার প্রতিবাদে গতকাল বেলা ১১টার দিকে গাজীপুর জেলা শহরের রাজবাড়ী মাঠে জাতীয় নাগরিক কমিটির গাজীপুর জেলা ও মহানগর শাখার আয়োজনে এ বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। রাজবাড়ী মাঠে একটি ট্রাকের ওপর তৈরি করা অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান, কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট সাকিব, এম এম সোয়েব, গাছা থানা প্রতিনিধি আনিসুর রহমান, কালিয়াকৈর থানা প্রতিনিধি সিমন বারী, সদর থানা প্রতিনিধি খন্দকার আল আমীন, টঙ্গী পশ্চিম থানা প্রতিনিধি নাবিল ইউসুফ প্রমুখ। পরে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের রেলক্রসিং পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে ফের জেলা প্রশাসকের কর্যালয়ের সামনে রাজবাড়ী সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ শুরু করে। বেলা আড়াইটার দিকে সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এতে সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। এ সময় বক্তারা ঘোষণা দেন হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে না পাঠানো পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান নেবেন। পরে বিকালে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ড. মোহাম্মদ নাজমুল করিম খান সমাবেশে একাত্মতা ঘোষণা করতে বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বক্তব্যকালে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। জিএমপি কমিশনার বলেন, ‘গতরাতে যে ঘটনাটি ঘটেছে তার জন্য আমি পুলিশের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এ জন্য ব্যর্থতা স্বীকার করছি। আমি আপনাদের বলতে চাই, আমরা এক এক করে ওই ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করব। আমি নিশ্চয়তা দিতে চাই, এখানে যারা পুলিশ আছে রেসপন্স করতে দেরি করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা নেব। আমি শুনেছি দুই ঘণ্টা পরে আমার ওসি আপনাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, আমি আপনাদের এই মুহূর্তে বলতে চাই, আমি তাকে সাসপেন্ড করব।’ পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ রাতে চিরুনি অভিযান চালানো হবে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দমন করার জন্য ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ পরিচালনা করা হবে।’ এ সময় পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, গাজীপুরের পুলিশ সুপারসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বক্তব্য রাখেন। এ সময় সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মিছিল করতে করতে নেতা-কর্মীরা ফিরে যান।
গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী এক ছাত্রের ওপর গুলি : গাজীপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক কর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সমাবেশ শেষে সন্ধ্যার পর শহরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের গেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত মো. মুবাশ্বির হোসাইন (২৪) গাজীপুর সিটি করপোরেশনের হাড়িনাল দক্ষিণপাড়া এলাকার হাফেজ আলী আহমেদের ছেলে। তিনি গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের মাস্টার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আহত মুবাশ্বির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুর জেলা শাখার কর্মী বলে জানিয়েছেন সংগঠনের জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সামিউল আলম নাবিল। আহতের স্বজনরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল দিনভর গাজীপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ভাওয়াল রাজবাড়ী সড়কে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন মুবাশ্বির। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সতীর্থ কয়েকজনের সঙ্গে ওই এলাকায় অবস্থান করে আলোচনা করছিলেন তিনি।
পরিকল্পিতভাবে আমাদের হত্যা করতে চেয়েছিল : ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক ও বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের ষষ্ঠ তলার ৬১৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ইয়াকুব আলী। তার মাথায় কুপিয়ে ও বেধড়ক মারধর করে আহত করা হয়েছে। মাথায় ১৪টি সেলাই নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তিনি গাজীপুরের টঙ্গী সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার বাড়ি গাজীপুরের গাছায়। তার পাশের বেডেই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন কাজী ওমর হামজা। তার মাথায় পাঁচটি, মুখে একটি কোপ দেওয়া হয়। এ ছাড়া দুই হাত ভেঙে দেওয়াসহ বেধড়ক পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম করা হয়। তার বাড়ি গাজীপুর সদরের শিমুলতলায়।
তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুর জেলার সংগঠক।
একই ওয়ার্ডে ভর্তি গাজীপুরের চান্দনা হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী আবদুর রহমান ইমন বলে, ‘আমার শরীর, মাথা ও পিঠে কোপানো হয়েছে।
এ সময় দুই যুবক একটি মোটরসাইকেলে সেখানে এসে তাদের লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত হাড়িনালের দিকে পালিয়ে যান। এতে ডান হাতের কনুইয়ের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান মুবাশ্বির। দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার পথে গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজের সামনে আরও এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে মুবাশ্বিরের সঙ্গে থাকা অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মঞ্জুর মোরশেদ জানান, আহত মুবাশ্বিরকে ডান হাতের কনুইয়ের নিচে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) উপকমিশনার (অপরাধ-উত্তর) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা এ রকম একটি ঘটনা শুনেছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। আমরা পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখছি।