ঈদে সিনেমা মুক্তি নিয়ে আবারও রাজনীতি শুরু হয়েছে। এবার ঈদে মুক্তিপ্রতীক্ষিত শাকিব খান অভিনীত ও মেহেদী হাসান হৃদয় পরিচালিত ‘বরবাদ’ সিনেমাটি আটকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি। তারা বলেন, বিগ বাজেটের এই সিনেমাটি প্রদর্শন করার জন্য সিনেমা হল মালিকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে হুট করে গত ২২ মার্চ এক চলচ্চিত্র পরিচালকের ষড়যন্ত্রে সিনেমাটি ঈদে যাতে আসতে না পারে সেই কলকাঠি নাড়া শুরু হয়েছে। ওই পরিচালকের কুবুদ্ধিতে শাকিব খান অভিনীত ও ওয়াজেদ আলী সুমন পরিচালিত প্রায় পাঁচ বছর আগে নির্মিত ‘অন্তরাত্মা’ সিনেমাটি হঠাৎ করে এই ঈদে মুক্তি দেওয়ার পাঁয়তারা শুরু হয়। ২৩ মার্চ সিনেমাটি সেন্সর বোর্ডেও জমা দেওয়া হয় যাতে ঈদে সিনেমাটি মুক্তি পায়। জানা গেছে, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক অনন্য মামুন ও কামাল মোহাম্মদ কিবরিয়া লিপু ‘অন্তরাত্মা’ সিনেমাটি ঈদে মুক্তির জন্য ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিয়েছেন। সিনেমা হল মালিকরা বলছেন, ‘অন্তরাত্মা’ অথবা যেকোনো সিনেমা ঈদে মুক্তি পাক। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমাদের কথা হলো, এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা শোচনীয়। সারা বছর মানসম্মত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে সিনেমার অভাবে সিনেমা হল চালাতে গিয়ে মালিকরা নাকাল। তার ওপর উপমহাদেশীয় সিনেমা আমদানিও মৌখিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এমন অবস্থায় সিনেমা ব্যবসার প্রধান মৌসুম খ্যাত বছরের দুই ঈদে মানহীন এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ম্যারিট নষ্ট হয়ে যাওয়া কোনো সিনেমা যদি ঈদে মুক্তি দিতে হয় তাহলে প্রকারান্তরে সিনেমা হল মালিকরাই চরম ক্ষতির মুখে পড়ে। কিন্তু দেশীয় সিনেমা জগৎ ধ্বংসের নীলনকশায় নিয়োজিত একটি গোষ্ঠী বারবার এই অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রদর্শক সমিতির নেতারা বলছেন, এমনিতেই দর্শক গ্রহণযোগ্য সিনেমার অভাবে বন্ধ হতে হতে নব্বই দশকের শেষদিকে দেশে থাকা প্রায় ১৪ শ সিনেমা হলের সংখ্যা এখন অর্ধশতেরও নিচে নেমে গেছে। বছরের দুই ঈদে মৌসুমি সিনেমা হল হিসেবে আড়াই শর মতো সিনেমা হল খোলে। এই অল্পসংখ্যক সিনেমা হলে প্রদর্শক ও প্রযোজক উভয় পক্ষ সন্তোষজনক ব্যবসা করতে গেলে চারটির বেশি সিনেমা ঈদে মুক্তি দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে ঈদ এলেই মানহীন ডজন ডজন সিনেমা মুক্তি দেওয়ার জন্য একশ্রেণির নির্মাতারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। নানা জায়গা থেকে দেনদরবার আর তদবির করে সিনেমা হল মালিকদের মানহীন সিনেমা চালাতে বাধ্য করে। এতে মানসম্মত সিনেমার অভাবে সিনেমা হল মালিকরা বছরের এই প্রধান সিনেমা ব্যবসার মৌসুমেও চরমভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে এবং সিনেমা হল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এ ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে দেশীয় সিনেমা শিল্প। প্রদর্শক সমিতি বলছে, দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির কোনো নির্বাহী কমিটি না থাকায় সিনেমা মুক্তির ক্ষেত্রে হযবরল অবস্থা দেখা দিয়েছে। তাই প্রদর্শক সমিতি সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সিনেমা মুক্তির জন্য রিলিজ কমিটি গঠন করেছে। এটি এখন সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এদিকে ‘বরবাদ’ সিনেমার অন্যতম প্রযোজক শাহরিণ আক্তার সুমি জানিয়েছেন, তিনি এই ঈদে যে কোনো মূল্যে তার সিনেমাটি মুক্তি দেবেন এবং গতকাল তিনি ‘বরবাদ’ সেন্সর বোর্ডে জমা দিয়েছেন। এদিকে দেশের বিভিন্ন সিনেমা হল মালিকরাও জানিয়েছেন তারা ঈদে বিগ বাজেট ও অ্যারেঞ্জমেন্টের ‘বরবাদ’ সিনেমাটি ব্যবসায়িক নিরাপত্তার কারণে তাদের সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শন করতে চান। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ করে ঈদে সিনেমা মুক্তি ক্ষেত্রে অপরাজনীতি নতুন কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ বড় ও ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৭ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেতে যাওয়া ঢাকার জাজ মাল্টিমিডিয়া ও কলকাতার যৌথ প্রযোজনার সিনেমা ‘নবাব’ ও ‘বস টু’ মুক্তির ক্ষেত্রে। যৌথ প্রযোজনার নামে প্রতারণা আখ্যা দিয়ে এই সিনেমা দুটি বাংলাদেশে মুক্তি যাতে পেতে না পারে তার জন্য আন্দোলনে নেমেছিল চলচ্চিত্র পরিচালক, শিল্পী সমিতিসহ ১৬টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত চলচ্চিত্র ঐক্যজোট। আর এই দাবিতে তারা ওই বছরের ২১ জুন সেন্সর বোর্ড ঘেরাও করে এবং সেন্সর বোর্ডের সামনে মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার, তৎকালীন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ও সেন্সর বোর্ড সদস্য ইফতেখার উদ্দিন নওশাদের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করে। এই হামলায় ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ গুরুতর আহত হন, পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই হামলায় ওই সময়ের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর, সহসভাপতি রিয়াজ, সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার ও প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুকে জড়িত থাকার অভিযোগ করে রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। সাধারণ ডায়েরি নম্বর ১২৪০। শেষ পর্যন্ত সব অপরাজনীতি গুঁড়িয়ে দিয়ে সে বছরের ঈদে সিনেমা দুটি বাংলাদেশে মুক্তি পায় এবং বাম্পার ব্যবসা করে। এর আগে ১৯৮৬ সালে ঈদে সিনেমা মুক্তি নিয়ে এ ধরনের আরেকটি বড় অপরাজনীতির ঘটনা ঘটেছিল। ওই বছরের রমজানের ঈদে নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ সিনেমাটি ঢাকার জোনাকী, মানসী ও রাজমণি সিনেমা হলে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট সিনেমা হল মালিকরা। এরই মধ্যে ঘটল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। চলচ্চিত্র পরিবেশকরা সিদ্ধান্ত নিলো ঈদে তারা কোনো সিনেমা হলে ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ চালাতে দেবে না। তারা আজিজুর রহমান বুলির ‘হিম্মতওয়ালী’ ছবিটিই প্রদর্শন করবে।
জানা গেছে, বুলির সঙ্গে যোগসাজশ করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা। কারণ তাদের ধারণা ছিল ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ রিলিজ হলে বিশেষ করে মহিলা দর্শকরা এই ছবিটি লুফে নেবে। এতে ব্যবসায়িকভাবে বিপাকে পড়তে পারে বুলির ‘হিম্মতওয়ালী’। শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং আদালতের আদেশে ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ ঈদে মুক্তি পায় এবং বাম্পার হিট ব্যবসা করে। অন্যদিকে বুলির ‘হিম্মতওয়ালী’ মুখ থুবড়ে পড়ে। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলছেন, আমাদের দেশের প্রধান গণমাধ্যম সিনেমা শিল্প বহুদিন ধরেই মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। চলচ্চিত্রের মানুষ ও সরকারের উচিত এই জাতীয় শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলা এবং এই শিল্প ধ্বংসের ক্ষেত্রে অপতৎপরতাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।