১. আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং ইচ্ছা প্রকাশিত হয়। এই অভিপ্রায় প্রকাশের মাধ্যমরূপে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। সংবিধান ও আইনে ভোটাধিকারের স্বীকৃতিই শেষ কথা নয়; নির্বাচনে অংশগ্রহণে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা অপসারণসহ ভোটাধিকার প্রয়োগের যথাযথ পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপরেই নির্বাচনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভরশীল। একমাত্র সৎ, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনব্যবস্থার মাধ্যমেই সর্বজনীন ভোটাধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব। সংবিধানে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনব্যবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন, কার্যাবলি এবং নির্বাচনসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। নির্বাচনি-রাজনীতি ক্রমশই জটিল রূপ ধারণ করেছে। সম্প্রদায়, ধর্মীয় সংকীর্ণতাবাদ, অর্থের প্রভাব এবং জনগণের সুষ্ঠু মতামত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে, একই সঙ্গে জাল ভোট, ভোট কেন্দ্র দখল, কালোটাকা, পেশিশক্তি, নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয়করণ, ফলাফল পাল্টে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। যা আমরা দেখেছি।
নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার কমিশন এসব সমস্যা-সংকট প্রতিরোধকল্পে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে সুপারিশসমূহ পেশ করেছে। এ কথা বলার অপেক্ষা থাকে না, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রধান বদিউল আলম মজুমদার নিশ্চিতভাবেই অবগত আছেন, নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে গণতন্ত্রের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। দীর্ঘদিন তিনি বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন, বলেছেন ও বিশেষভাবে কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালার দিকে তাকাতে পারি।
২. বাংলাদেশে নির্বাচন পরিচালনব্যবস্থাকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার জন্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন এবং তার ক্ষমতা ও কার্যাবলি সংবিধানে নির্দিষ্টভাবে লিখিত আছে। বিপুলসংখ্যক নিরক্ষর ভোটদাতাদের পক্ষে সব দলের কর্মসূচি ও ভূমিকা পর্যালোচনার ভিত্তিতে সুচিন্তিতভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব নয়। নিরক্ষরতার জন্য তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে নির্লিপ্ততার উন্মেষ ঘটে। ভোটদাতাদের অংশগ্রহণের সুশীল আকাক্সক্ষা ও উদ্যোগ সর্বজনীন ভোটাধিকারের সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ভোটদাতা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন না। এই অনুপস্থিতির দ্বারা ভোটদাতার অনীহা এবং চেতনার অভাব সৃষ্টি হয়েছে। ভোট কেন্দ্রে গেলেও তাঁরা ঠিকমতো ভোট দিতে পারেন না, নেপথ্যে নাজেহাল ও নিরাপত্তার ভয়ভীতি কাজ করে। এই পরিস্থিতি সর্বজনীন ভোটাধিকারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩. নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন মোটাদাগে ১২টি সুপারিশ করেছে। ১২টি সুপারিশের মধ্যে প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ঐকমত্য, নাগরিক সমাজের অর্থবহ অংশগ্রহণে যোগ্য ও দক্ষ, জনগ্রাহ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রত্যয় দ্ব্যর্থভাবে উপস্থাপন করেছেন। অবশ্য এর জন্য নতুন আইন প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। ভারতে সংসদ নেতা, বিরোধী দলের নেতা এবং অন্য সংখ্যাধিক প্রাপ্ত দলের নেতাদের সমঝোতায় নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। সুপারিশমালায় জোর দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতায়নের ওপর (১.২)। কমিশনকে নির্বাচন স্থগিত, বাতিল এবং পুনর্নির্বাচনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব সচিব নিয়োগ নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। নির্বাচনে নির্বাহী বিভাগের কালো থাবা বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূর্বের নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগ গিলে খেয়েছিল- যার ভুক্তভোগী আমি স্বয়ং। সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যাতে নয়-ছয় না করতে পারে তার ব্যবস্থা বর্ণিত হয়েছে। এমনকি কমিশনের দায়িত্ব পালনে (১.৩) অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে অভিযোগ উঠলে সংবিধানের ১১৮ ও ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুরাহা করা। সুপারিশে এ কথা বলার অর্থ এই যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হলেও তাদের দায়বদ্ধতা ও শাস্তির অধীনে আনা।
৪. নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্তকর্তাদের মধ্যে থেকে রিটার্নিং/সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা, প্রয়োজনে প্রশাসনের অন্য ক্যাডার থেকেও নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা তাদের থাকবে। অতীতে নির্বাহী কর্মকর্তারা এসব পদে যেন ‘হায়ারে’ এসেছেন এই মনোভাব ও আচরণ দৃশ্যমান ছিল, আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা তাই বলে। কমিশনের সুপারিশে তাদের নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচন-উত্তর সময়ে পক্ষপাতিত্ব, অনিয়ম ও অযোগ্যতাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রশিক্ষণ-ভাতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটদের ভাতার বিষয়টি পর্যালোচনা করার বিধান (১.৫) বর্ণিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে (যেমন-ইভিএম) আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিতে স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
৫. সুষ্ঠু নির্বাচনের বাধা কোথায়? প্রথমত এই বাধা নির্বাহী বিভাগের কালো থাবা। এই থাবাকে দুর্বল কিংবা শৃঙ্খলিত করার বিধান ব্যক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের পরিবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করা। নিয়ম-বিধিবিধান মেনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে রেফারি নিয়োগ এবং দলীয়করণমুক্ত নির্বাচনি ব্যবস্থাপনা। তৃতীয়ত স্বাধীন বিচার বিভাগ। এসব কিছুর জন্য প্রয়োজন সংস্কার। পেশ করা সুপারিশমালা নির্বাচনি ব্যবস্থা সংস্কারে এসব সমাধানের সূত্র দিয়েছে। আশু করণীয় সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে এক দলের পরিবর্তে অন্য দল ক্ষমতাসীন হলে জনগণের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হবে না। আমরা রাজনীতিবিদ বাকপটু কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ধূম্রজালের আশ্রয় নিই। যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে ব্যর্থ হই, এর হাজারো উদাহরণ রয়েছে।
৬. সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে লক্ষণীয় যে অতীতে যারা হাটে-ঘাটে, মাঠে চাঁদাবাজি ও লুট করেছে তারা পালিয়েছে, পরিবর্তে ক্ষমতাসীন হবেন এমন ভাবনার দলগুলোর ক্যাডারদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন অব্যাহতভাবে চলছে। পতিত সরকারের সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের বিপরীতে এখন নব্য জুলুমকারী চক্র জনগণের ওপর চড়াও হয়েছে। জনগণ ভয়ার্ত ও নিরাপত্তাহীন। এ অবস্থার অবসান না হলে জুলাই অভ্যুত্থানের মৌল চেতনা ও স্পিরিট বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নীতিবোধ ও দায়িত্ব সহকারে প্রত্যেকটি সুপারিশ করেছে। প্রধান নির্বাচন সংস্কার কমিশনের নেতৃত্বে গঠিত টিম কর্তৃক শ্রমলব্ধ গবেষণা, অনুসন্ধান, অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তারপরও কথা থেকে যায়, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জীর্ণ অবনতিতে সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব কী? সেটি অবশ্য নির্বাচন-সংস্কার কমিশনের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না। তবু তারা দায় এড়াতে পারে না।
৭. নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নিয়ে দুয়েকটি কথা বলা আবশ্যক।
ক. সুপারিশসমূহের ১.২ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শিরোনামের ভেতর- ‘দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে’ পয়েন্টটি দল নিবন্ধন প্রাক্কালে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
খ. সুপারিশসমূহের ২.২ মনোনয়নপত্র শিরোনামের (ক) ধারাতে ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ পরিচালনা ম্যানুয়াল অনুযায়ী দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৭ ধারায় উল্লেখিত মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করার সকল বিষয়াদি বহাল রাখা যেতে পারে। অনলাইনে মনোনয়ন জমাদানের ব্যবস্থা রাখা বিধেয়।
গ. সুপারিশসমূহের ২.৪ নির্বাচনব্যবস্থা শিরোনামের (গ) ধারাতে ৪০% ভোটারের পরিবর্তে ৫১% ভোট কাস্ট যোগ করা যেতে পারে।
ঘ. সুপারিশসমূহের ২.৪ নির্বাচনব্যবস্থা শিরোনামে ভিতরে ‘কোনো সংসদ সদস্য তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যে জনগণের বিরাগভাজন হলে এক-তৃতীয়াংশ ভোটারদের স্বাক্ষরসহ নির্বাচন কমিশনে আবেদন করলে এবং তা তদন্তে প্রমাণিত হলে ওই আসন শূন্য ও পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ জব-পধষষ-এর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
ঙ. সুপারিশসমূহের ৩.০ প্রধানমন্ত্রী শিরোনামের (গ) ধারাতে ‘পার্লামেন্টারি পার্টির যিনি সংসদ নেতা হবেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন’ যুক্ত করা যেতে পারে। ‘সংসদ নেতা’ এই শব্দগুচ্ছ বাদ দেওয়া যেতে পারে। যুক্ত হতে পারে যিনি দলীয় প্রধান হবেন, তিনি সরকারপ্রধান হবেন না।
চ. সুপারিশসমূহের ৬.০ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শিরোনামের (খ) ধারাতে ‘প্রশাসনের সর্বস্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার বিধান যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ সংসদ সদস্যগণ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিশনার বা মেম্বাররা ভোট দেওয়ার অধিকারী হবেন।
ছ. পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। ১৯৭০ ও ’৭৯ সালে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের পদ্ধতি ও রীতি বলবৎ ছিল। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ‘প্রক্সি’ ভোট জটিলতা ও অনিয়মের সৃষ্টি করবে।
জ. এই সুপারিশমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদ ও বিধিবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধন অপরিহার্য।
বাংলাদেশে যেখানে গণতন্ত্রের সুচারু অনুশীলন হয়নি সে ক্ষেত্রে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা মাইলফলক হিসেবে গণতন্ত্র, দেশ-জাতির কাছে বিবেচিত থাকবে।
♦ লেখক : ’৭২ সালের খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী, লেখক ও গবেষক