একুশে ফেব্রুয়ারিকে বলা হয় স্বাধীনতার সূতিকাগার। একুশের পথ ধরেই এসেছে বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের সাফল্য। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পথ ধরে গড়ে ওঠে বাঙালির ঐক্য। ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ছাত্র ও যুবসমাজের নেতৃত্বে। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তেমন একটা ছিল না। ছাত্র ও যুবসমাজ বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দৃঢ় ভূমিকা পালন করলেও রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন দ্বিধান্বিত। কিন্তু একুশের ছাত্র-জনতার আত্মাহুতি দ্বিধার অবসান ঘটায়। একুশের পথ ধরেই গড়ে ওঠে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট। এ যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটায়। ৩০৯ আসনের মধ্যে মাত্র ৯টিতে জয়ী হয় মুসলিম লীগ। বাদবাকি সব আসনে যুক্তফ্রন্ট ও অন্যরা জয়ী হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। সাধারণ মানুষ ছিল সংশয়ের ঘোরে। কিন্তু ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত ও অন্যদের জীবনদান দলমতনির্বিশেষে সব মানুষের মনোজগৎকে নাড়া দেয়। বাঙালিরা যে পাকিস্তানি নয়, এ উপলব্ধির বিকাশ ঘটায়। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে তৎকালীন পূর্ব বাংলা বা আজকের বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে শেখে। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে পাকিস্তানের শাসক বনে যান। এ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররাই প্রথম রুখে দাঁড়ায়। ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্ররা। মুক্তিসংগ্রামে ছাত্রদের অবদান ছিল অনন্য। স্বাধীনতার পর ছাত্রসমাজই সাহসের সঙ্গে লড়েছে ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে। ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়েছেন সাহসিকতার সঙ্গে। ’৯০-এর গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্ররা। এমনকি যে জুলাই অভ্যুত্থান দেশবাসীকে স্বৈরতন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করেছে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছে তারও নেতৃত্বে ছিল ছাত্ররা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। আমরা পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা। আমরা পেয়েছি জাতীয় সংগীত। আমাদের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি পৃথিবীর মধুরতম সংগীতের একটি। যা বাংলাদেশের মানুষের জন্য গর্ব করার মতো এক খবর। ইউনেস্কোর জরিপে পৃথিবীর মধুরতম ভাষারও স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলা। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩২ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষা সপ্তম অবস্থানে। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা বাংলাভাষী মানুষের প্রধান আবাসভূমি। ভারতের ওড়িশা, আসাম, বিহারসহ আরও কয়েকটি রাজ্যের অনেক মানুষ বাংলা ভাষার চর্চা করে। পাকিস্তানেও অন্তত ২৫ লাখ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়াসহ ইউরোপের অনেক দেশে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা বিপুল। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে অনেক এলাকায় দোকানপাটে বাংলা সাইনবোর্ড দেখা যায়। এমনকি ইউরোপ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলা ভাষায় একাধিক সংবাদপত্র প্রকাশ হচ্ছে। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন ও বেতারে। বিশ্বের বিভিন্ন গৃহযুদ্ধকবলিত দেশ বা ভূখন্ডে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কাজ করছেন বাংলাদেশের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। তাঁরা সেসব দেশের শান্তি স্থাপনে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এসব দেশের মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। ফলে সেখানেও বাংলা ভাষা চর্চা হচ্ছে নানাভাবে। সিয়েরা লিওন বাংলা ভাষাকে তাদের দেশে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও বাংলা ভাষার জন্য এক বিরাট অর্জন। অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, বিশ্বায়ন ও পরিবেশগত প্রভাবে বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দের সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে ভাব প্রকাশের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন বাক্য। মৌখিক প্রয়োগে এসব শব্দ-বাক্য নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও লিখিতরূপে এগুলোর প্রয়োগ কতটা যথার্থ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ কথাও স্বীকার্য যে দুনিয়ার সব ভাষার বিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা। ইতিহাস, সভ্যতা, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য কিংবা রাজনীতির মতো ভাষাও তার নির্দিষ্ট গতিপথে চলে। তাতে জোর খাটানো চলে না। কালের বিবর্তনে বাংলা ভাষাও স্বতন্ত্র রূপ ধারণ করেছিল প্রায় বারো-তেরো শ বছর আগে। বর্তমানে বাংলা একাডেমিকে ব্যবহারিক বাংলা ভাষার অভিভাবক বিবেচনা করা হয়। সমাজজীবনের প্রাত্যহিক ব্যবহার্য ভাষার চেয়ে কবি-লেখকের ভাষা ও শব্দের প্রতি অধিক পরিমাণে আকৃষ্ট হয় পাঠক। বাংলা ভাষায় যেমন বিভিন্ন ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় তেমনি এ দেশের শিল্প-সাহিত্যের ভাষাও সাধারণ মানুষের ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে নিরন্তরভাবে। সাধারণ পাঠক অনেক সময় নির্ভর করেন শিল্পী-সাহিত্যিকের ভাষা ও রচনাশৈলীর ওপর। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এসব কারণেও সংবাদপত্র বা শিল্পী-সাহিত্যিকরা অধিক দায়বদ্ধ থাকেন ভাষার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে। একসময় বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দ ঢোকানোর প্রবণতা যেমন একটা বিশেষ গোষ্ঠীর ছিল, তেমনি আরবি, ফারসি শব্দ ঢোকানোর প্রবণতাও অন্য গোষ্ঠীর ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ বিশেষ করে ইংরেজি শব্দ-বাক্য ঢোকানোর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভাষার বিবর্তনের ক্ষেত্রে রক্ষণশীল মনোভাবের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ভাষার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতার গড্ডলিকা প্রবাহে সায় দেওয়া ঠিক হবে না
আগেই বলেছি একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আন্দোলন করতে শিখিয়েছে। আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন একুশের উত্তরাধিকার। আমাদের স্বাধীনতা এসেছে একুশের পথ ধরে। মুক্তিযুদ্ধেও কাজ করেছে একুশের হার না মানা চেতনা। ’৯০-এর স্বৈরতন্ত্রবিরোধী গণ অভ্যুত্থানের একজন কর্মী হিসেবে বলব, একুশের চেতনাই আমাদের স্বৈরাচারী এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামানোর লড়াইয়ে জড়িত হতে সাহস জুগিয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আমাদের ছাত্ররা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে যে হার না মানার মনোভাবে তার পেছনেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে একুশের চেতনা।
♦ লেখক : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাবেক জিএস