‘অপারেশন ডেভিল হান্টের’ অভিযানে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেত্রীর ছেলেকে আটকের পর বিএনপি নেতাদের মুচলেকা এবং টাকার বিনিময়ে থানা হেফাজত থেকে ১০ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকালে আটক শাকিল হাওলাদারকে ছেড়ে দেয়া হয় বলে জানান বাউফল থানার ওসি। তিনি বলেন, সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে অপারেশন ডেভিল হান্টের আওতায় আমরা শাকিলকে থানায় এনেছিলাম। তার (শাকিল) বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা বা অভিযোগ ছিল না। এছাড়া স্থানীয় বিএনপি নেতারাও তাকে ভালো বলে সুপারিশ করেছেন। মামলা না থাকায় পরিবারের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শাকিলের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলেও জানান ওসি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও বাংলাদেশি সাংবাদিক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন অভিযোগ তুলে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন পটুয়াখালীর বাউফল থানার এসপি ও ওসির বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার রাতে তিনি এ অভিযোগ করে পোস্ট দিয়েছেন।
ইলিয়াস হোসেন স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘পটুয়াখালীর বাউফল থানার ওসি ২ লাখ ও এসপি ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে কালাইয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি রেশমার ছেলে ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি শাকিলকে গ্রেফতারের ১০ ঘণ্টা পর ছেড়ে দিয়েছে!’
স্ট্যাটাসে তিনি আরও বলেন, ‘ওসি কামাল হোসেন গেল ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী। তার বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।’
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা খায়রুন নাহার রেশমার (৫০) ছেলে শাকিল হাওলাদার (৩০)। শাকিলের বাবার নাম বাবুল হাওলাদার। মা রেশমা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্যও ছিলেন। শাকিলের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ৫ আগস্টের আগে শাকিল ও তার মায়ের দাপটে অতিষ্ঠ ছিল এলাকাবাসী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মা খানিকটা চুপসে গেলেও বিএনপির স্থানীয় কতিপয় নেতার সঙ্গে মিলেমিশে দাপট অব্যাহত রেখেছে শাকিল। সপ্তাহখানেক আগে প্রতিবেশী রিপনের জমির বীজ ধান খেয়ে ফেলে শাকিলের গরু। এর বিচার চাইতে গেলে ধারালো অস্ত্র নিয়ে রিপনকে ধাওয়া করে শাকিল। জীবন বাঁচাতে রিপন পার্শ্ববর্তী মনির হাওলাদারের বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেখানে গিয়ে হামলা করে শাকিল। কুপিয়ে বাড়ি ভাঙচুর ও ঘরে থাকা লোকজনকে মারধর করে। এছাড়াও একই এলাকা শৌলা গ্রামের রশিদ হাওলাদারের ছেলে মনিরুল ইসলামকে মারধর ও হুমকি দেওয়ার ঘটনায় সোমবার বাউফল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মনিরুল ইসলাম।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শাকিল হাওলাদারসহ বিবাদীরা ও আমরা একই বাড়ির লোক। শাকিল নিজে গাঁজা-বাবা সেবন করে ও এলাকায় বিক্রি করে। সে বিভিন্ন কারণে আমাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে। আমার মাকে বিভিন্নভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে যাওয়ার সময় আমার বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ৪৪ হাজার টাকার ক্ষতি হয়।
শাকিলকে ছেড়ে দেওয়ার ওই মুচলেকায় উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা শাকিলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে চিনে ও সত্যায়ন করে এবং স্থানীয় ও উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সুপারিশে শাকিল থানা থেকে মুক্ত হতে ইচ্ছুক। ভবিষ্যতে বিএনপি দলের প্রতি আনুগত্য থেকে সকল প্রকার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন মর্মে মুচলেকায় উল্লেখ করেন। মুচলেকায় স্বাক্ষর করেছেন কালাইয়া ইউনিয়ন বিএনরি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক একেএম মনজুর আলম, কালাইয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক জিএম নিউটন ও বিএনপির সক্রিয় কর্মী রিয়াজ রহমান।
মুচলেকায় স্বাক্ষর করা বিএনপি নেতা জিএম নিউটন সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেহেতু ছোট খাটো বিষয়। একই এলাকার মানুষ। তাই তারা ছাড়িয়ে নিয়েছেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবক লীগের একাধিক নেতা বলেন, শাকিল এলাকায় বখাটে প্রকৃতির লোক। ওর মা মেম্বার থাকাকালে তার কার্যক্রম সবই ছেলে শাকিল চালাতো। এলাকায় সে মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শাকিলের মত বখাটেকে গ্রেফতারের পর ছেড়ে দেওয়া হলো। এটা দুঃখজনক।
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, শাকিলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা ছিল না। তাছাড়া স্থানীয় বিএনপি নেতারাও তাকে ভালো বলে সুপারিশ করেছেন। তাকে অপারেশন ডেভিল হান্টের আওতায় থানায় এনেছিলাম। মামলা না থাকায় পরিবারের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শাকিলের বিরুদ্ধে মনির হাওলাদারের দেওয়া লিখিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে টাকার বিনিময়ে শাকিলকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি ভিত্তিহীন ও অমূলক বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, আমি এর আগে কখনও থানায় চাকরি করিনি। পটুয়াখালী আদালতে কর্মরত ছিলাম। দেশের পট পরিবর্তনের পর আমি বাউফল থানায় যোগদান করেছি। এর আগে বরগুনা কোর্টে ছিলাম বলেন ওসি।
ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মনগড়া অভিযোগ।
টাকার বিনিময়ে আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) আনোয়ার জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে এ প্রতিনিধি বহুবার তার সরকারি মোবাইল নাম্বারে ফোন করলেও তা তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাকিলের মা কালাইয়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা সম্পাদিকা খায়রুন নাহার রেশমার মোবাইল ফোনে সকাল থেকে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বিডি প্রতিদিন/আরাফাত