অনলাইন ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে জুয়া। দেশীয় আইনে অবৈধ এসব জুয়ার আসর তৈরি করা হয় ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করে। শত শত কোটি টাকার লেনদেন চলে প্রতিদিন। দেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন বয়সি নারী পুরুষ এর সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এই লেনদেনের একটি বড় অংশ পাচার হয়ে যায় দেশের বাইরে। অনলাইন মাধ্যমে এআই টুলস ব্যবহার করে এসব জুয়ার প্ল্যাটফরম প্রচারণা ব্যবহার করা হয় বিশ্বব্যাপী পরিচিত বিভিন্ন তারকাদের। এর মধ্যে রাজনীতিক থেকে বড় অভিনেতারা রয়েছেন। দেশের মধ্যে তারকা খ্যাতি পাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই জুয়ার প্ল্যাটফরম প্রচারণা চালাচ্ছেন। জুয়ার মাধ্যমে অল্পসময়ে ধনী হওয়ার নেশায় সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকেই। একটি গোষ্ঠী হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, এই জুয়া খেলা জমে ওঠে সাধারণত কোনো বিশেষ ইভেন্টকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা কেন্দ্র করে বিভিন্ন ইভেন্ট তৈরি করে জুয়ার বোর্ড সাজানো হয় ভার্চুয়াল মাধ্যমে। সেখানে অংশ নেয় বিভিন্ন বয়সি ও পেশার নারী-পুরুষ। অনুসন্ধানে জানা যায়, সারা দেশের অলিতে-গলিতে চায়ের দোকানে হরহামেশাই চলছে জুয়ার রমরমা আসর। ৫০০ টাকার বিনিময়ে খোলা হয় আইডি। এরপর বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে খেলা ঘিরে বাড়তে থাকে জুয়ায় বিটের পরিমাণ। তবে এই প্ল্যাটফরমে সব থেকে জনপ্রিয় 1XBET ও 1xbetbd.com। যা নিয়ন্ত্রিত হয় রাশিয়া
থেকে। এ ছাড়াও দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত www.mazapbu.com ও www.betbuzz365.live নামক বেটিং ওয়েব সাইটের সুপার এজেন্টরা বাংলাদেশে নিয়োগ করে মাস্টার এজেন্ট। সুপার এজেন্টরা প্রতিটি ভার্চুয়াল কারেন্সি ১০০ টাকায় বিক্রি করে।
আর দেশীয় মাস্টার এজেন্টরা লোকাল এজেন্টদের কাছে তা বিক্রি করে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়। ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকায় নিয়োগ দেওয়া হয় লোকাল এজেন্ট। তারা আবার লোকাল জুয়াড়িদের কাছে পিবিইউ বিক্রি করে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নির্দেশে বন্ধ করা হয় অনলাইনে জুয়া খেলার ১৭৬টি সাইট। এরপর থেকে নানা সময়ে জুয়ার সাইট বন্ধ করা হলেও থেমে থাকেনি জুয়ার এই রমরমা অনলাইন আয়োজন। ভিপিএন ব্যবহার করে অংশ নিচ্ছে জুয়াড়িরা।
সিআইডি সাইবার সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখানে বেশ কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। ১৮৬৭ সালের আইনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে আমাদের। ১৫৮ বছরের এই পুরনো আইনে সকালে আটক করলে বিকালে জামিন পেয়ে যায় আসামি। জুয়াতে যে শাস্তির বিধান রয়েছে তা খুবই সামান্য। চলমান আইনে জুয়া খেললে ২০০ টাকা জরিমানা আর দুই মাসের জেলের বিধান রয়েছে। আমরা ৩০ ধারায় বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনে মামলা নিতে পারতাম। বর্তমানে এই আইনে মামলা নেওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, এখানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জুয়া ও অনলাইন বেটিং ঠেকাতে সময়োপযোগী আইন দরকার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের জুয়াড়িদের মধ্যে উঠতি বয়সি তরুণরাই বেশি। এ ছাড়াও মধ্য বয়স্ক থেকে বৃদ্ধ, শিক্ষিত-নিরক্ষর সবাই জড়িয়েছে অনলাইন জুয়ার জালে। লাখ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জুয়ার প্রকোপ বন্ধ করা না গেলে রসাতলে যাবে তরুণ প্রজন্ম। এদিকে অবৈধ অনলাইনে জুয়ার প্রচারণায় যুক্ত হয়ে সমালোচনায় পড়েছেন তারকারাও। দেশীয় তারকাদের কেউ কেউ শুভেচ্ছাদূত হয়ে সরাসরি এসব জুয়ার অ্যাপের প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন। কেউবা তাঁদের অনুষ্ঠানে এসব জুয়ার অ্যাপের স্পন্সরের মাধ্যমে যুক্ত থেকেছেন। নুসরাত ফারিয়া, পরীমণি, অপু বিশ্বাস, মাহিয়া মাহি, শবনম বুবলীর মতো তারকাদেরও দেখা গেছে জুয়ার অ্যাপের প্রচারণায়। এবার বিপিএলে জান্নাতুল পিয়াকে একটি জুয়ার অ্যাপের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি অনুষ্ঠানে দেখা যায়। উপস্থাপনার সময় এই মডেল ও অভিনেত্রী জুয়ার অ্যাপের নামসংবলিত একটি টিশার্ট পরিহিত ছিলেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, এই অ্যাপের শুভেচ্ছাদূত নন তিনি।