রাজনীতি তো কোনো ধর্ম নয় যেকোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির নেতৃত্বে এর আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিকাশ কীভাবে ও কেন ঘটল? বাংলাদেশে যারাই রাজনীতি করেন, এমনকি যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও করেন, কোরআনের আইন চান অথবা রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চান, অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, তারাও পাশ্চাত্যের আধুনিক গণতন্ত্র, এক কক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট, ‘এক ব্যক্তি এক ভোট,’ সংসদীয় ধরনের সরকারব্যবস্থা ইত্যাদির জয়গান করেন। এসবের মাধ্যমে ধর্মীয় লোকজন প্রত্যক্ষভাবে হলেও স্বীকার করেন যে রাজনীতিতে ধর্মের প্রায়োগিক কোনো উপযোগিতা নেই। ধর্ম পৃথিবীতে মানুষকে নীতিনৈতিকতা, শৃঙ্খলাবোধ শেখাতে পারে, যা অন্য সাধারণ মানুষের মতো রাজনীতিবিদদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সৎ, নিষ্ঠাবান ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকার সহায়তা করার অন্যতম গুণাবলি। সব ধর্মের মূল সুর পার্থিব জীবনের চেয়ে সুখের হোক, দুঃখের হোক পরকালীন অনন্ত জীবন।
বাংলাদেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বুঝে হোক, আর না বুঝে হোক, তারা রাষ্ট্রের সুষ্ঠু পরিচালনা ও বিকাশের জন্য সংসদীয় গণতন্ত্র এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য ধর্ম চায়। জনগণের এই চাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে ব্যক্তি ও পরিবারপ্রধান হয়ে ওঠার কারণ ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বিগত ৭৭ বছরেও ভারতবর্ষের মানচিত্রের পূর্বাংশে অবস্থিত পূর্ববঙ্গ প্রথমে পাকিস্তান নামে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক জনগণকে ভোটের মর্ম বোঝানোর ব্যর্থতা। এর ফলে গত পোনে আট দশকে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে ভোটাররা অর্থাৎ জনগণ দলে দলে বিনা-খরচায় চা-শিঙাড়া ও পানবিড়ি খেয়ে তাদের পছন্দনীয় দলের প্রার্থী ‘কলাগাছ’ হলেও তাদের ভোট দিয়ে অথবা ভোট দেওয়ার দায়িত্ব দলের লাঠিয়ালদের ওপর ন্যস্ত করে ‘বিপুল ভোটে জয়ী’ করে সেসব অসার কদলী বৃক্ষকে মহান জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছে।
জনগণ ভোটের মর্ম না বুঝলে এবং একটি পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন বা বিনা ভোটে নির্বাচিত হলে এবং শীর্ষ ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক দল অনুরূপ ধরনের নির্বাচনকে ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন বলে দাবি করতে কোনো দ্বিধা করে না। যেহেতু ব্যক্তি এবং উক্ত ব্যক্তির পরিবারের আনুগত্য ও বন্দনাই দলের অন্য নেতাদের উচ্চপদ লাভসহ অবাধ লুটপাট করার সুযোগ সৃষ্টির প্রধান যোগ্যতা, সেজন্য কেবল দলের সেই শীর্ষ ব্যক্তিই নয়, এমনকি তার গৃহভৃত্যরাও দলের অন্য নেতা-কর্মীদের তোষামোদের পাত্রে পরিণত হয়। এভাবেই বাংলাদেশে সংসদীয় ধাঁচের গণতন্ত্র ও ভোটের নামে অলিখিত রাজতান্ত্রিক শাসনের সূচনা করেছিলেন বাংলাদেশের ‘অবিসংবাদিত নেতা’র শিরোপাপ্রাপ্ত মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, যদি তিনি রূপকথার রাজার মতো হতে না চাইতেন, তাহলে তিনিও ‘বাপুজি’-খ্যাত ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো সবার শ্রদ্ধাভাজন থাকতে পারতেন। তিনি কী প্রাচীন গ্রিক রাজনৈতিক দর্শন থেকে রাজা হওয়ার শিক্ষা লাভ করেছিলেন?
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তার গুরু প্লেটোকে অনুসরণ করে সরকারের ধরনের ওপর বলতে গিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের বর্ণনা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি মানুষ এবং তাদের পোষা প্রাণী, স্ত্রী, দাস এবং শিশুদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ধরা যাক, একটি পরিবারের কাঠামো রাজতান্ত্রিক, কারণ প্রতিটি পরিবার মাত্র একজন শাসক দ্বারা পরিচালিত। স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের ওপর প্রজাতান্ত্রিক আচরণ করে এবং তাদের সন্তানদের ওপর রাজতান্ত্রিক সরকারের আচরণ করে; তারা দাসদের ওপর তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে এবং পরিবারের ওপর তাদের রাজকীয় অবস্থানকে ব্যবহার করে।’
কিন্তু অ্যারিস্টটল যখন পারিবারিক সম্পর্কে তারই তৈরি এই রূপককে রাজনৈতিকভাবে প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেন, তখন তিনি একইভাবে উপলব্ধি করেন যে এ ধরনের উপমা প্রয়োগের সুযোগ সীমিত অথবা আদৌ কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু শেখ মুজিব অ্যারিস্টটলের রূপকের শাসক হতে চেয়েছিলেন এবং তার পরিবার ছিল তার বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথামালার রাজনীতির শিকার জনগণ। দেশ, দেশবাসী ও গণতন্ত্রের জন্য তার ভালোবাসার কথা যে প্রকৃতপক্ষে তার নিজের ও দলের স্বার্থ উদ্ধারে জনগণকে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে তার সহজাত বাকচাতুর্যের অংশ ছিল, জনগণ তা উপলব্ধি করার মতো শিক্ষিত বা মেধাসম্পন্ন ছিল না। ‘১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত বিশাল জনসমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ তিনি ১৯৭৫-এ বাকশাল গঠন ও দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে প্রমাণ করেছেন যে তিনি যা বলতেন, তা বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু জনগণ তাকে বিশ্বাস করেছিল, তাদের সেই বিশ্বাসের অবমাননা করার পরিণতি তাকে করুণভাবে ভোগ করতে হয়েছে। তার পতন ছিল তার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার ফলশ্রুতি।
বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের এ এক সমস্যা, সবাই আবেগের দাস। তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবেগ প্রবল। তারা বিপুল সংখ্যায় ধর্মীয় সমাবেশে যায়, সারা রাত আলেম-উলামা ও গুরুদের কথা শোনে, নবী-অবতারদের ত্যাগের কাহিনি শুনে চোখের পানি ফেলে; অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে অস্ত্র হাতে ধেয়ে যায় কারও জীবন নিতে ও নিজের জীবন দিতে। আমার বয়সি মানুষের স্মৃতিতে ১৯৭১-এর দৃষ্টান্ত এখনো উজ্জ্বল। ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে হলেও ব্যাপক অর্থে অরাজনৈতিক কারণে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তরুণদের মধ্যে জীবন দেওয়ার যে উন্মাদনা দেখা গেছে, তা ছিল আবেগের বিস্ময়কর প্রতিফলন।
১৯৭৫ সালে পিতার পরিণতি থেকে শেখ হাসিনার শিক্ষা গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে যেভাবে শেখ মুজিবসর্বস্ব আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচন করে ভারত থেকে আনা হয়েছিল, তাতে তার মধ্যে অহঙ্কার, সপরিবার পিতৃহত্যার প্রতিহিংসা চরিতার্থ স্পৃহা জাগ্রত হওয়া ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। তিনি যদি কেবল ব্যক্তি শেখ হাসিনা হতেন, তাহলে প্রতিশোধ গ্রহণে যে জিঘাংসার পরিচয় দিয়েছেন, এমনকি একই কারণে দেশবাসীর ওপর যে হত্যাযজ্ঞ ও তাণ্ডব চালিয়েছেন তা সম্ভব হতো না। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার আগে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থান কী ছিল? কিছুই না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কন্যা ও একজন বিজ্ঞানীর স্ত্রী ছিলেন। তিনি কী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বা সভাপতি হওয়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন? অথবা তার মাঝে কি আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা হিসেবে দলকে পরিচালনা করার যোগ্যতা ছিল? আদৌ ছিল না। তার এ পদলাভ উত্তরাধিকার সূত্রে ছিল না অথবা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরূপ কোনো ‘ওয়াসিয়ত’ও ছিল না যে তার অবর্তমানে তার জ্যেষ্ঠ সন্তান দলে তার পদাভিষিক্ত হবেন। আওয়ামী লীগ যে গণতন্ত্রের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে সেই গণতন্ত্রে পিতার স্থলে পুত্র-কন্যার অভিষিক্ত হওয়ার সুযোগও নেই। দলের শীর্ষনেতা নির্বাচনের পদ্ধতি অনুসরণ না করেই তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার পিতার নাম ও গুরুত্বকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিল মাত্র।
বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তা হওয়ার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে শেখ হাসিনাকে খুব বেগ পেতে হয়নি। দৃশ্যত আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ ও বিএনপির মিত্র জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রতি বিরাগ পোষণ করে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে বিজয় অর্জনের পথ করে দেয়। ১৯৭৫ সালের ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা এবং এরই ধারাবাহিকতায় মাঝখানে মাত্র এক মেয়াদ ছাড়া ২০০৯ সাল থেকে টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা দখলে রেখে দেশবাসীর ওপর তাদের জুলুম ও জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং সর্বোপরি ক্ষমতার চিরস্থায়ী আওয়ামীকরণের পেছনে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের বালসুলভ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হলে, তা বাড়িয়েও বলা হবে না অথবা ঐতিহাসিকভাবেও তা অসত্য হবে না। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব সৃষ্টির পেছনে জামায়াতের একজন মাত্র ব্যক্তি সম্পর্কে বিএনপি সরকার জামায়াতের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করায় অথবা সে সম্পর্কে সরকার নীরবতা পালন করায় জামায়াত নিজেদের পরিণতি ও দেশের ভবিষ্যৎ না ভেবে রাজনৈতিক মূর্খতার পরিচয় দিয়েছিল। অবশ্য জামায়াত এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি যে কী কারণে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তারা বিএনপির ওপর নাখোশ হয়েছিল। জামায়াতের আচরণকে রহস্যজনক মনে হতো না, যদি তারা আবারও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া না বাঁধত।
ব্যক্তিনির্ভর কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আসীন থাকলে রাষ্ট্র যে সেই ব্যক্তির জমিদারি এবং জনগণ যে তার প্রজা হয়ে ওঠে, আধুনিক বিশ্বে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরের বাংলাদেশ তারই দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনা ছিলেন ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনবিশিষ্ট বাংলাদেশের প্রবল পরাক্রমশালী জমিদার, অথবা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী এক রানি এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষ তার প্রজা। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এক লাঠিয়াল বাহিনীর নাম। লাঠিয়াল বাহিনীর এমনই দাপট যে তাদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ জনগণের মাঝে ধূমায়িত ক্ষোভের মাত্রা তারা বুঝতে পারেনি। নিজেদের অজেয় ভেবেছিল তারা এবং তাদের জমিদার বা রানিকে ভেবেছিল দশহস্তবিশিষ্ট দেবী মা দুর্গার প্রতিরূপ। সবকিছুর যে বিলয় বা ধ্বংস আছে, তাদের মাথায় তা প্রবেশ করেনি। যদি প্রবেশ করেও থাকে তা এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছে যখন তারা ধ্বংসের প্রান্তে চলে গিয়েছিল, যেখান থেকে তাদের আর ফেরার উপায় ছিল না। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে। নিপীড়িত দেশবাসীর পুষে রাখা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার লাঠিয়াল বাহিনী আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের অবসান ঘটে।
শেখ হাসিনার পতন ঘটলেও শাসকের দম্ভ, আত্মগর্ব ও ঔদ্ধত্য বাংলাদেশ ও দেশবাসীর জন্য যে কত সর্বনাশা ও ধ্বংসাত্মক ছিল বাঙালি তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে। ভবিষ্যতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা শুধু বাংলাদেশ নয়, বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত থেকে অন্যান্য দেশেরও শেখা উচিত। কবি জন কিটস তাঁর ‘ওড টু এ নাইটিংগেল’ কবিতায় বলেছেন, দাম্ভিকতা মানুষকে আত্মগর্বে অন্ধ করে ফেলে, বিষণ্নতায় ঠেলে দেয়। তার মাঝ থেকে নম্রতা, শালীনতা ও ভব্যতার গুণ হারিয়ে যায়। তিনি যা বলেন তা পরিণত হয় অহঙ্কারের প্রলাপে। অনিয়ন্ত্রিত অহঙ্কার তাকে শ্রেষ্ঠত্বের বিপজ্জনক অনুভূতিতে জাপটে ধরে এবং বেলুনের মতো স্ফীত হতে থাকে। কবি পার্সি শেলি তাঁর এক কবিতায় এই বিভ্রম বা মনোবৈকল্যকে একসময়ের পরাক্রমশালী শাসকের উপড়ে ফেলা মূর্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ছিল সেই শাসকের অহঙ্কার এবং ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ী বৈশিষ্টের প্রমাণ। কবি লিখেছেন : ‘Look on my works, ye mighty, and despair!’ (আমার কাজগুলো দেখ, হে পরাক্রমশালী এবং আমার হতাশা দেখ)! শাসকের অহঙ্কারের পরিণতি ছিল কারণ তার সাম্রাজ্যের ধ্বংস। পিতা শেখ মুজিব ও কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের দখলে রাখার যে একগুঁয়েমি করেছেন তাতে দেশ এক পা এগিয়ে বহু পা পিছিয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের মধ্যে প্রায় ২৫ বছরই বাংলাদেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখার জন্য যত ব্যগ্র দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার দিকে তারা মনোযোগী না হওয়ায় বাংলাদেশ বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে।
কবি উইলিয়াম আর্নেস্ট হেনলি তার ‘ইনভিকটাস’ কবিতায় শাসকের আত্মকেন্দ্রিকতা ও অতি ঔদ্ধত্যের প্রতিধ্বনি করেছেন, তা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য। কবিতার শেষ লাইনটি হচ্ছে : ‘I am the master of my fate, I am the captain of my soul.’ (আমিই আমার ভাগ্য নিয়ন্তা, আমিই আমার আত্মার পরিচালক)। আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছিল। তিনি তাকে মোকাবিলা করতে সক্ষম কোনো প্রতিপক্ষ দেখেননি। দৃশ্যমান সব প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে তিনি তার চারপাশে গড়ে তুলেছিলেন সীমাহীন দম্ভের বলয়। কবি টি এস এলিয়টও একইভাবে তার ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রোক’-এ বলেছেন যে, অহঙ্কারী ব্যক্তি ভাবতে অক্ষম যে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তার মনে সন্দেহ উঁকি দেয়। কিন্তু অহঙ্কার ও দম্ভ কাটিয়ে উঠতে পারেন না। তিনি আত্ম-অহঙ্কারে আচ্ছন্ন, তার বিশ্বাস তার কাজের পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী।
শেষ পর্যন্ত তার অহংবোধের কাছে পরাভূত হতে চান না। কিন্তু পরাজিত হতেই হয়। দুঃশাসনের অনিবার্য পরিণতি পরাজয় ও পলায়ন এবং অদৃষ্ট মন্দ হলে জনরোষে মৃত্যু। শেখ হাসিনা জীবিত আছেন। দিল্লির অজ্ঞাত, কিন্তু নিরাপদ অবস্থান থেকে তিনি এখনো দম্ভোক্তি করে চলেছেন, সীমাহীন ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করছেন। দিনের পর দিন উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে তিনি কী দেশকে অস্থিতিশীল করায় ইন্ধন জোগাচ্ছেন এবং দেশবাসীকে কী আবারও বিপদের মধ্যে ফেলতে যাচ্ছেন? এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো আওয়ামী লীগের মতো অশুভ ও বারবার অধঃপতিত রাজনৈতিক শক্তি দেশের কোনো ক্ষতিসাধন করতে না পারে।
লেখক : নিউইয়র্কপ্রবাসী, সিনিয়র সাংবাদিক