এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। এটি নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত। নওগাঁ জেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এই ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের অবস্থান। এই বিহারের আদি নাম সোমবার বিহার।
১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তিটি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। আয়তনের সাথে ভারতের নালন্দা মহাবিহারের তুলনা করা হয়। মোট ৭০.৩১ একর জমির উপর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। বিহারটি ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের অতি বিখ্যাত ধর্ম চর্চার কেন্দ্র ছিল। চীন, তিব্বত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বৌদ্ধরা এখানে ধর্ম চর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। আকর্ষনীয় স্থাপত্য বিশাল আয়তন ও ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারটিকে দেখতে প্রতিদিন এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও সাধারন মানুষের সমাগম হয়ে থাকে। ঈদে প্রচুর দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভীড় থাকে। যা সকলের নজর কাড়ে। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে ছুটে এসেছেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো থাকায় দর্শনার্থীরা ঘুরতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে গিয়ে দেখা যায় দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। অনেকেই পরিবার পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে পাহাড়পুর ঘুরতে এসেছেন। এ সময় অনেককে সেলফি তুলতেও দেখা যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল চোখেপড়ার মতো। দর্শনার্থীরা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের চতুর্দিক ঘুরে ঈদের আনন্দ উপভোগ করছেন। ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে রয়েছে সৌন্দর্য বর্ধনশীল ও আকর্ষনীয় মূল প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বারের দক্ষিন পার্শ্বের কক্ষে রয়েছে প্রতœ সামগ্রী ও বই। উত্তর পার্শ্বে কক্ষে রয়েছে টিকিট কাউন্টার। তাঁর পার্শ্বে রয়েছে মহিলা টয়লেট ও পুরুষ টয়লেট। আরো আছে ১টি মসজিদ। রয়েছে অফিসারদের জন্য কোয়ার্টার, ব্যাটিলিয়ানদের জন্য আনসার কোয়ার্টার, স্টাফ কোয়ার্টার। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে ১০টি ছাউনি সেই ছাউনিগুলো সেজেছে বিভিন্ন সাজে। আর এই ছাউনিগুলিতে ক্লান্ত দর্শনার্থীরা বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আর দর্শনার্থীর ছাউনিগুলোর পার্শ্বেই রয়েছে পুরাতন আদলে নির্মিত ১টি পুকুর। এছাড়া পাথওয়ের মাঝে রয়েছে বসার স্থান। আর এ পাথওয়ে নির্মান করা হয়েছে মনোরোম পরিবেশে। রয়েছে গাড়ী পার্কিং এর জায়গা। এর মধ্যে পিকনিক কর্নার থেকে সরাসরি বৌদ্ধ মন্দির প্রবেশ পথে রয়েছে ১টি ব্রিজ। বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান ফটকসহ ভিতরে রয়েছে মোট ৩টি ব্রিজ। আর বৌদ্ধ মন্দিরের চুড়ায় উঠার জন্য আছে কাঠের সিঁড়ি। আর এসব দৃশ্য দেখে যেন মন ভরে যাবে যে কারো।
জানা যায়, ঈদুল ফিতরের ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও রাজধানী ঢাকা থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী আনন্দ করতে এই ঐতিহাসিক বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুরে ছুটে এসেছেন। ঈদের দিন দুপুর থেকে এই পাহাড়পুরে দর্শনার্থীদের আগমন বাড়তে থাকে। আর দর্শনার্থীদের আগমন উপলক্ষে বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর সংলগ্ন হোটেল, রেস্তোরা কসমেটিস ও ঝিনুকের দোকানগুলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন বর্ণিল সাজে সাজিয়েছেন দোকানিরা। দোকানী আল আমিন জানান, এই রোজার ঈদের এক সপ্তাহ ধরে দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এই বৌদ্ধবিহারে। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার দর্শনার্থী এই পাহাড়পুর পরিদর্শন করতে আসে।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ডাবরি গ্রাম থেকে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার দেখতে এসছিলেন বনি আমিন ও রওনক জাহান দম্পতি। তারা বলেন, আমরা দুই ছেলেকে নিয়ে এখানে এসেছি। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে এসে সবাই খুবই আনন্দ পেয়েছি। ঐতিহাসিক বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুরের নাম আমরা অনেক শুনেছি ও জেনেছি কিন্তু সময়ের অভাবে এটি বাস্তবে দেখার সময় হয়নি। আর এ বছর ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে এসে বাস্তবে এতো সুন্দর দৃশ্য দেখে খুব ভাল লাগছে। দর্শনার্থী রোকাইয়া আক্তার সিন ও লুৎফুন নাহার স্মৃতি বলেন, আমরা এখানে এর আগে বহুবার এসেছি। কিন্তু এবার এখানে এসে মনে হচ্ছে নতুন এক বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুরকে দেখছি ও পুরো পাহাড়পুরটি পরিদর্শন করে আমরা খুবই আনন্দ পেয়েছি ।
পাহাড়পুর জাদুঘরের কাস্টডিয়ান ফজলুল করিম আরজু বলেন, গতবারের তুলনায় এবার ঈদে দর্শনার্থী বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এসেছেন। রাস্তায় রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা থাকায় এবার যানজট নেই। ঈদের ছুটিতে রেকর্ড পরিমান দর্শনার্থী আরো আসবে বলে আশা করছি।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল বলেন, এই বৌদ্ধবিহার শুধু নওগাঁ জেলা নয়; এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার। ঈদ ছাড়া প্রতিদিন এখানে শত শত দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছাউনি ও বেঞ্চ। এতে করে এই গরমে দর্শনার্থীরা খুব বেশি ক্লান্ত হচ্ছে না। দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার দর্শন করছেন। আমাদের নতুন নতুন অনেক পরিকল্পনা রয়েছে এই পাহাড়পুর বৌদ্ধবাহারটি ঘিরে।
বিডি প্রতিদিন/এএম