খুলনার রমজান ফকির। একটি ফৌজদারি মামলায় গত বছর ১৮ জানুয়ারি হাই কোর্ট থেকে খালাস পান। তবে রায়ের কপি কারাগারে না পৌঁছায় মুক্তি মিলছিল না। চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইনে ফোন করে অভিযোগ করেন তার ছেলে মো. হাফিজুর রহমান। তাৎক্ষণিক কাজ শুরু করে হেল্পলাইন মনিটরিং সেল। পরে রায়ের কপি জেলে পৌঁছার পর মুক্তি মেলে রমজান ফকিরের।
ঢাকার আল আমিন একটি রিট মামলার বাদী। রুল শুনানি শুরুর জন্য একের পর এক তারিখ পরিবর্তন হলে নথি আসছিল না কোর্টে। আইনজীবীর মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করেও ফল মেলেনি। নথি উদ্ধারে সুপ্রিম কোর্টের অনেক কর্মচারী টাকাও দাবি করেন। শেষে আল আমিন দ্বারস্থ হন সুপ্রিম কোর্টের হেল্পলাইনে। ফোনে কথা বলে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ পাঠান গত বছর ২৩ ডিসেম্বর। অভিযোগ পেয়েই কাজ শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট হেলল্পলাইন মনিটরিং সেল। উদ্ধার হয় নথি, শুনানিও শুরু হয়েছে। শুধু এ দুজনই নন, গত পাঁচ মাসে সুপ্রিম কোর্টের হেল্পলাইন থেকে সেবা পেয়েছেন ১ হাজার ৭৬৩ জন। এসব সেবাগ্রহীতার ফোনকলে অভিযোগ এসেছে অনিয়ম, ঘুষ, কাজে অবহেলা, বিলম্বে সেবাপ্রাপ্তি ও অসদাচরণের। সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি ও অধস্তন আদালতের ২৫ বিচারকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ এসেছে। পাশাপাশি অভিযোগ আসে আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও। হেল্পলাইন মনিটরিং সেলের চার মাসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নির্দেশে এই হেল্পলাইনের কার্যক্রম শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে হেল্পলাইন মনিটরিং সেল। প্রথমে একটি মোবাইল ফোন নম্বরে সেবা চালু করা হলেও বর্তমানে দুটি নম্বর (০১৭৯৫৩৭৩৮৬০, ০১৩১৬১৫৪২১৬) চালু রয়েছে। সরাসরি ফোনকলের পাশাপাশি এ নম্বর দুটিতে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ গ্রহণ সেবাও চালু আছে। সপ্তাহে পাঁচ দিন (রবিবার-বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত হেল্পলাইন নম্বর খোলা থাকে। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটেও নম্বর দুটি গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইনে পাওয়া সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে সেবাগ্রহীতা আল আমিন মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি অভিযোগ করেছিলাম ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটির সময়। জানুয়ারিতে কোর্ট খোলার পরই আমার রিটের নথি উদ্ধার হয়েছে। তিনি বলেন, এই নথি উদ্ধারে আইনজীবী অনেক চেষ্টা করেছেন। কোনো ফল মেলেনি। অনেকে অনেক টাকা-পয়সাও চেয়েছেন। পরে বিষয়টি আমি সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইনে জানালে তারা দ্রুতই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
হেল্পলাইন মনিটরিং সেলের পাঁচ মাসের অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর হেল্পলাইন চালু হওয়ার পর থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশ থেকে আইনি পরামর্শ, মামলা সম্পর্কিত তথ্য ও অভিযোগ দাখিল সংক্রান্ত মোট ১৭৬৩টি কল আসে। এর মধ্যে আইনি পরামর্শ সেবা গ্রহণের জন্য ৯৬৭টি এবং বিভিন্ন মামলার তথ্য জানতে চেয়ে ৬৭১টি কল এসেছে। সব কলের বিষয়ে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন অনিয়ম, ঘুষ, কাজে অবহেলা, বিলম্বে সেবাপ্রাপ্তি, অসদাচরণ ইত্যাদি সম্পর্কিত পাঁচ মাসে মোট ১২৫টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ৬৬টি অভিযোগ বিভিন্ন অনিয়ম, ঘুষ, কাজে অবহেলা, অসদাচরণ ইত্যাদি সম্পর্কিত। এর মধ্যে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারকের বিরুদ্ধে একটি, হাই কোর্ট বিভাগের বিচারকদের বিরুদ্ধে তিনটি, জেলা আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে ২৫টি, আপিল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একটি, হাই কোর্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুটি, জেলা আদালতের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ২৫টি এবং আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ৯টি অভিযোগ এসেছে সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইনে। এসব অভিযোগের বিষয়েও এরই মধ্যে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বাকি ৫৯ অভিযোগ বিলম্বে আইনি সেবাপ্রাপ্তি সংক্রান্ত। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে বলে হেল্পলাইন মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।