জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির ৭৫ বছর পরও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়িটি আজও ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে। অনেক ঘটনার সাক্ষী হলেও অযত্ন-অবহেলার কারণে আজ অনেকে এটি ভুলতে বসেছে। অথচ প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের শিক্ষণীয় বিষয় হওয়ার পাশাপাশি দর্শনীয় কেন্দ্র হতে পারে এটি।
দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে পুনর্ভবা নদীর কোলঘেঁষে নিরিবিলি-কোলাহলমুক্ত ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে জমিদারবাড়িটি অবস্থিত। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ শত পরিবার অধ্যুষিত ঘুঘুডাঙ্গা এক জমিদার পরিবারের নাম। যা ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার নামে খ্যাত।
ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায় বসবাসরত বংশধর ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে দিনাজপুর জেলায় যে কজন জমিদার ছিলেন তার অন্যতম ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার। ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন দিনাজপুরের ১১টি থানায় এ জমিদারের এস্টেট ছিল। এস্টেট থেকে বার্ষিক ১ লাখ টাকা খাজনা দিতে হতো ব্রিটিশ সরকারকে। এ জমিদারের আওতায় ১৮টি কাচারি ও ৪১টি তহসিল অফিস দ্বারা পরিচালিত হতো। ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের গোড়াপত্তন করেন নবীর মোহাম্মদের একমাত্র ছেলে ফুল মোহাম্মদ। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির স্থায়ী ছিল প্রায় ৮০ বছরের মতো। তবে কবে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারি শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেননি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭৭১ সালে চালু পঞ্চসনা ব্যবস্থা পরবর্তীতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নীতিতে ১৭৮৯ সালে দশসালা নীতি চালু করে। এতে পরিষ্কার যে, ১৭৭১ থেকে ১৭৮৯ সালের মধ্যে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির সূচনা হয়। আর ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ জমিদারি অটুট ছিল। ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়িটি একতলা-দোতলা মিলে একটি অনুপম পাকা ভবন। ভগ্নদশায় রয়েছে ফুল-লতাপাতায় সজ্জিত বিরাট প্রবেশদ্বার। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। আর অন্যান্য জমিদার পরিবারের মতো ছিল পাইক-পেয়াদা, সিপাহি, বাবুর্চি, খানসামা, খামারু ইত্যাদি। ছিল একজন ম্যানেজারও। বাহির বাড়িতে ছিল মেহমানখানা, সঙ্গে একটি সুদৃশ্য মসজিদ। সপ্তাহ বা মাসে বসত মেহমানখানা চত্বরে গ্রামপ্রধানদের আসর। আর এ আসরে আলোচনা হতো শান্তিশৃঙ্খলা, সামাজিক, চাষাবাদ ও আর্থিক বিষয়াদি। মেহমানখানার পেছনদিকে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার পরিবারের দুটি কবরস্থান রয়েছে।
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার এস্টেটের কিছু দুর্লভ সামগ্রী ছিল। একটি স্বর্ণের চেয়ার যা বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
এ ছাড়া ১০১ ভরি ওজনের স্বর্ণের তৈরি কৃত্রিম কই মাছ, রুপার বাটযুক্ত ছাতা, পাখা, রোপ্য-নির্মিত লাঠি, তামার ডেকচিসহ দুর্লভ সামগ্রী ১৯৭১ সালের পাকবাহিনীর হাতে লুণ্ঠিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের গোড়াপত্তন করেন নবীর মোহাম্মদের একমাত্র ছেলে ফুল মোহাম্মদ। আজও তার উত্তরসূরিরা সমাজের উঁচুস্থানে অবস্থান করছেন। কিন্তু জমিদারবাড়ির আগের স্থাপনা ভঙ্গুররূপেই রয়েছে। ইতিহাস জানার আগ্রহে আজও অনেক মানুষ সেই নিরিবিলি-কোলাহল মুক্ত ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ির গ্রামে ছুটে যান।