রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশ চালানো যাবে না। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্বের একটি। সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে। তাই নির্বাচনের জন্য কিছু সংস্কার এখনই করতে হবে। কিছু নির্বাচনের পরে করলেও হবে।
গতকাল ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেন, সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে। ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকাতে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি উঠছে, কারণ বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা দেখেছি, বিচার বিভাগ কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রশাসন ও বিচার বিভাগ পুনর্গঠনসহ সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেও ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, সংস্কার শুধু সরকারের ইচ্ছার বিষয় নয়, বরং এটি রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের বহুল আকাক্সিক্ষত বলেও মন্তব্য করেন ড. রীয়াজ। তিনি বলেন, সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক সনদ প্রণয়নে জনগণকে সোচ্চার হতে হবে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্বৈরাচার যাতে আর ফিরতে না পারে, তাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার করা। যারা অন্যায় করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার করা। আর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব এই তিনটি। নির্বাচনের জন্য কিছু সংস্কার এখনই করতে হবে। কিছু নির্বাচনের পরে করলেও হবে। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও দায়বদ্ধ করতে হবে। নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার দরকার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক দলের অনেক দোষ আছে, কিন্তু রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশ চালানো যাবে না। দলে সংস্কার করতে হবে। তবে নির্বাচনের দিকে না গিয়ে সংস্কারের দিকে গেলে, তা হবে বিরাজনীতিকরণ। যৌক্তিক কিছু সংস্কার করে নির্বাচনের দিকে যেতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো সংস্কারে কমিশনের সুপারিশে এসেছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। নাগরিকদের মতামত পেলে এটি আরও সমৃদ্ধ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ২০০৭-০৮ সালের পর সংস্কার শব্দটা গালিতে পরিণত হয়েছিল, এখন আর সেটা মনে করা হচ্ছে না। অনেক কমিশন করা হয়েছে, সহস্র সুপারিশ এসেছে। তবে সাংবিধানিক সংস্কারটাই আসলে মূল সংস্কার। পাকিস্তান সরকারের সময়কার নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করে ১৯৭২ সালে সংবিধান করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের উপযোগী হয়নি। এরপর সংবিধান সংশোধন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থে হয়েছে।
সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, লাখো শহীদের বিনিময়ে পাওয়া সংবিধান কলমের খোঁচায় কেউ বদলে দিতে পারে না। সংস্কার প্রস্তাবে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে রাষ্ট্রধর্ম রেখে দেওয়া যৌক্তিক হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগের বিষয় নয়। এটা সবার আন্দোলন ছিল। প্রজাতন্ত্রের জায়গায় নাগরিকতন্ত্র নিয়ে আসাটাও অযৌক্তিক।