দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ পদ, বিভিন্ন খাতভিত্তিক পেশায় দক্ষ শ্রমিক, গবেষক এবং সৃজনশীল কাজে নারীর উপস্থিতি এখনো হাতেগোনা। কৃষিজ, বনজ ও মৎস্যকর্মী হিসেবে নারীরা সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন। শহরের তুলনায় গ্রামের নারীরা শ্রমশক্তিতে বেশি যুক্ত। অনানুষ্ঠানিক খাত, কম দক্ষতা ও স্বল্প মজুরির কাজে তারা বেশি যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও চাকরির বাজারে এখনো দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী কর্মীর যথেষ্ট অভাব। একই অবস্থা প্রবাসী নারীদেরও। দেশের বাইরে যে নারী শ্রমিকরা কাজ করতে যাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগেরই দক্ষতা নেই বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার কৃষিতেই বেড়েছে। শিল্প ও সেবা খাতে নারীর অংশগ্রহণ আশানুরূপভাবে বাড়েনি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েরা এগিয়ে এলেও উচ্চশিক্ষায় এখনো মেয়েরা পিছিয়ে। সার্ভিস সেক্টরে কাজে যে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন সেখানে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। সমাজব্যবস্থার কারণে নারীরা বেশির ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে জড়িত। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে যেতে না পারার কারণ হচ্ছে বাল্যবিয়ে এবং কম বয়সে মা হওয়া। আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে এখনো নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। এ ছাড়া নিয়োগকর্তারা বিভিন্ন কারণে ছেলেদের নিয়োগে বেশি প্রাধান্য দেন।
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানসম্পন্ন কাজ, মূল ধারার শ্রমবাজার এবং উচ্চ মজুরির কাজে নারী-পুরুষের পার্থক্য অনেক বেশি। নারীদের টেকনিক্যাল এবং প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষার দিকে এগিয়ে আসতে হবে। যেসব মেয়ে উচ্চশিক্ষার পরও বিয়ে করে সন্তান লালনপালনে ব্যস্ত, তাদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের শ্রমশক্তিতে আনতে হলে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সামাজিক ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। কর্মজীবী মায়ের সন্তান প্রতিপালনে ডে-কেয়ার সুবিধা থাকতে হবে। মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে সরকার প্রণোদনা দিয়ে যদি এ পর্যন্ত ধরে রেখে এর সঙ্গে শ্রমবাজারের সংযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে শ্রমশক্তিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাড়বে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০১০ সালে ৩৬ শতংশ ছিল। ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। দেশের মোট ৭৩ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন নারী কর্মে নিয়োজিত। এর মধ্যে শহরে আছে ৪ দশমিক ৬১ মিলিয়ন আর গ্রামে ২০ দশমিক ৭২ মিলিয়ন নারী। শতাংশের হিসেবে মোট জনশক্তির ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। নারীরা নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ নিলেও বাস্তবে তা খুব বেশি কাজে লাগাচ্ছেন না। শহরে ৪২ দশমিক ০৪ শতাংশ নারী এবং গ্রামে ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তবে ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন হাতেগোনা নারী। একই অবস্থা ড্রাইভিং ও মোটর মেকানিক প্রশিক্ষণের। স্বাস্থ্য ও প্যারামেডিকেল সেবায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ক্রাফটিং, পাইপ ফিটিং, ওয়েল্ডিং, বিউটিফিকেশন, ক্যাটারিং ও হোটেল রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ অবকাঠামোর কাজ, ফার্নিচার নির্মাণের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন শহর ও গ্রামের নারীরা। এর মধ্যে কম্পিউটারের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, বিউটিফিকেশনের কাজ ছাড়া অন্য কাজে নারীদের অংশগ্রহণের হার কম। কিছু নারী শিক্ষিকা, নার্স ও অফিসে অভ্যর্থনা কর্মী হিসেবেও কাজ করেন।
শহরের নারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ সেবা বা বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন। সবচেয়ে বেশি দক্ষ কৃষিজ, বনজ ও মৎস্যকর্মী হিসেবে ৬০ দশমিক ৪৪ শতাংশ নারী কাজ করেন। কৃষি খাতে আছে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ১৮ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী। শিল্প খাতে আছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। বিভিন্ন পেশাজীবী হিসেবে কর্মরত আছেন ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ নারী। টেকনিশিয়ান হিসেবে আছেন ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সার্ভিস ও সেলস ওয়ার্কার হিসেবে আছেন ৯ দশমিক ১ শতাংশ নারী। ক্রাফটিং-এর কাজে আছেন ৩৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। প্লান্ট মেশিন অপারেটর হিসেবে আছে ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ নারী।