বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী রপ্তানি কমছে। অথচ দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার অর্ধেকই বেকার। এর মধ্যে ৩০ শতাংশেরই নেই কোনো ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। বিগত চার বছরে দক্ষ কর্মী রপ্তানি অর্ধেকে নেমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক শ্রমবাজার ধরে রাখতে দক্ষ কর্মী তৈরিই বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ। কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করতে পারলে রেমিট্যান্স প্রবাহ চাপের মুখে পড়বে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছে। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার সাড়ে ৪৯ শতাংশ। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, কোনো কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে (এনইইটি) নেই ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। যার মধ্যে তরুণদের হার অনেক বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ১১ দশমিক ১ শতাংশ আর নারী ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়া দেশের শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষ বৈষম্যও প্রকট। মোট শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণ সাড়ে ৭৮ শতাংশ। বাকি সোয়া ২১ শতাংশ নারী।
এদিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী পাঠানো কমে গেছে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী থেকে এ হার ক্রমেই কমছে। এর বিপরীতে স্বল্প দক্ষ ও আধাদক্ষ কর্মী রপ্তানি বেড়েছে। ফলে প্রবাসী শ্রমবাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) দক্ষতাভেদে অভিবাসী কর্মীদের চার ভাগে ভাগ করে। এগুলো হলো পেশাজীবী, দক্ষ, আধাদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ কর্মী। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যান ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে পেশাজীবী ছিলেন ৪১ হাজার ৬২১ জন, যা মোট শ্রমবাজারের ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। দক্ষ কর্মী ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৪ জন বা ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ, আধাদক্ষ কর্মী ১ লাখ ৫৯ হাজার ১২৮ জন বা ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, আর স্বল্পদক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে গেছেন ৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৮০ জন বা ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনশক্তি রপ্তানির অর্ধেকের বেশি স্বল্পদক্ষ হিসেবে বিদেশে গেছেন। এর আগে ২০২৩ সালে মোট রপ্তানিকৃত জনশক্তির ৫০ শতাংশই ছিল স্বল্পদক্ষ। ২০২২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭৩ দশমিক ০৮ শতাংশ।
বিগত চার বছরের তুলনায় ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ ছিল। ২০১৯ সালে মোট রপ্তানিকৃত জনশক্তির ৪৪ শতাংশই ছিলেন দক্ষ কর্মী; যা ২০১৮ সালে ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৪৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে দক্ষ কর্মী গেছেন মোট জনশক্তির ৪২ দশমিক ০৮ শতাংশ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষতা উন্নয়ন ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করে বিদেশে পাঠালে ভবিষ্যতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ চাপের মুখে পড়তে পারে। আমাদের ট্রেনিং সেন্টারে যে দক্ষতা তৈরি হচ্ছে, সে দক্ষতা দিয়ে বিদেশে কাজ পাচ্ছেন না। শ্রমবাজার নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপভিত্তিক গবেষণা করতে হবে। ওইসব দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বেশি শ্রমিক না পাঠিয়ে অল্প শ্রমিক পাঠিয়ে তাদের বেতন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন শ্রমবাজার খুলতে হবে।