সংস্কৃত ভাষায় তালপাতায় লেখা পুথি, মহাকবি কালিদাসের হাতে লেখা পুথি, প্রাচীন রামায়ণ, নলখাগড়ার কলম ও ভূষা কালি দিয়ে লেখা দুর্গাপূজাপদ্ধতি, মহাভারত, রঘুরাম কবিরাজ, কাশিরাম দাশ, ত্রিলোচন দাস, ভর্তৃহরি, পদ্মনাম দত্ত, রাম দত্ত, অমর সিংহ, মচ্চানক্যের লেখা পা-ুলিপির মতো অন্তত ২০০ পা-ুলিপি রয়েছে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে। এখানে মোট বইয়ের সংখ্যা এক লাখ। এর মধ্যে বাংলা ৭৩ হাজার। ইংরেজি ২০ সহস্রাধিক। উর্দু, আরবি, হিন্দি ভাষার তিন শতাধিক। ৬০ শতাংশ উপন্যাস, ৩০ শতাংশ রেফারেন্স বই এবং বাকি ১০ শতাংশ গবেষণাগ্রন্থ।
১৭৪ বছর ধরে যশোর অঞ্চলে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছে লাইব্রেরিটি। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ’৪৭-এর দেশভাগ, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিমান বাহিনী এখানে ঘাঁটি তৈরি করলে সম্পদ, দলিলপত্র নষ্ট হয়, হারিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের সময় পুলিশ তালা ঝুলিয়ে দেয় ও অনেক মূল্যবান বই পুড়িয়ে দেয়। এত কিছুর পর এখনো লাইব্রেরির যে সংগ্রহশালা, তা অবাক করার মতো। নথি অনুযায়ী ১৮৫৪ সালে যশোর, বগুড়া, বরিশাল ও রংপুরে পাবলিক লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা হয়। গ্রন্থাগারবিষয়ক গবেষক ড. মোফাখখার হোসেনের দাবি- যশোর পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫১ সালে। বিষ্ণুশর্মা পন্ডিতের নিবন্ধেও এ দাবির সত্যতা পাওয়া যায়। যদি তা-ই হয়, তাহলে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রথম গণগ্রন্থাগার এটিই। লাইব্রেরির বিভিন্ন নথি থেকে পাওয়া যায়, ১৯২৮ সালে নড়াইলের জমিদার রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার পাবলিক লাইব্রেরি ও এর সংলগ্ন নিউ আর্য থিয়েটার ও টাউন ক্লাবকে একত্র করে যশোর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। যদুনাথ নড়াইলের জমিদার হলেও তিনি যশোরের বিশিষ্ট আইনজীবী, যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান ও যশোর জেলা বোর্ডের মনোনীত সভাপতি ছিলেন। তাঁর সম্পত্তির ওপরই যশোর ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠে। লাইব্রেরির প্রকাশনা থেকে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ১৪ অক্টোবর যশোর ইনস্টিটিউটের বার্ষিক সাধারণ সভায় ‘লাইব্রেরি সেকশন অ্যাজ দ্য যশোর পাবলিক লাইব্রেরি’ নামটি পরিবর্তন করে ‘যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি’ নামটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী লাইব্রেরিটি পরিচালনা করছেন। সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয় লাইব্রেরিটি। মূল সংগঠন যশোর ইনস্টিটিউটের সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে লাইব্রেরির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। সম্পদের মধ্যে ৩ দশমিক ২৪ একর জমিতে রয়েছে বি. সরকার ঘূর্ণায়মান মঞ্চ। অবিভক্ত বাংলার প্রাচীনতম নাট্যমঞ্চগুলোর মধ্যে এটি একটি। রয়েছে লাইব্রেরিসংলগ্ন টাউন হল মাঠ, যা বর্তমানে মুন্সী মেহেরুল্লাহ ময়দান নামে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভাস্থল এটি। গ্রন্থাগারের পাশেই আছে শত বছরের পুরনো টাউন হল, যা এখন আলমগীর সিদ্দিকী হল নামে পরিচিত। শহরের এমএম আলী রোডে ৩৩টি দোকানসহ ইনস্টিটিউট মার্কেট ও শহরের আরএন রোডে ৪৭ শতক জমিতে ১৭টি দোকানসহ উন্মেষ মার্কেট রয়েছে যশোর ইনস্টিটিউটের। যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু বলেন, ‘প্রাচীন আমলের পা-ুলিপিগুলো সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা দরকার। ফান্ডও প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের কাছে অনেক আগেই সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুই হয়নি। তিনি আরও বলেন, যশোর ইনস্টিটিউটের অনেক সম্পদ থাকলেও আয় খুবই কম। মান্ধাতার আমলের দোকানভাড়া কিছুদিন আগে সামান্য বাড়ানো হয়েছে, যা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়াই কষ্টকর। লাইব্রেরির ডিজিটালাইজেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের কাজ তিন বছর ধরে চলছে, ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩০ শতাংশ আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে।