চীনের বৈদ্যুতিক যানবাহনে নেতৃত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠান BYD দেশীয় প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হাইব্রিড এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন বিক্রির দিক থেকে রেকর্ড অর্জন করেছে। তারা ২০২৪ সালে ৪.২৭ মিলিয়ন নতুন শক্তিচালিত যানবাহন (NEV) বিক্রি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্যাটারি বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড যানবাহন। যা অতীতের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪১.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৪ সালের নির্ধারিত প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন ইউনিটের লক্ষ্য অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালে নতুন শক্তিচালিত যানবাহন (NEV) যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রয় প্রায় ৪.২৫ মিলিয়ন ইউনিটে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪১.০৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলো (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) ২০২৪ সালে পৃথিবীজুড়ে আরও একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বছর পার করেছে, চীনের ক্রেতারা এর প্রধান বাজারটি ধরে রেখেছে এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় এর অগ্রগতি সামান্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিল।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শীর্ষ দেশ- চীন এক্ষেত্রে একটি মাইলফলক অর্জন করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অটো মার্কেট রয়েছে চীনে, যেখানে গেল বছরের জুলাই মাসে নতুন গাড়ি (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে- পিওর ব্যাটারি ইলেকট্রিক ভেহিকেল এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকেল। চীনের কোম্পানিগুলো যেমন : BYD তাদের সস্তা বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) দিয়ে বিশ্বব্যাপী দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রেও বৈদ্যুতিক যানবাহনের অগ্রগতি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ২০২৫ সালে এই কেনাবেচায় অর্থায়নে যে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতি রয়েছে, তা আরও জটিল হতে পারে, বিশেষত- যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ক্ষমতায় বসলে দেশটির বাণিজ্য পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। তবুও মূলধারার ক্রেতারা আধুনিক এই ইলেকট্রিক ভেহিকেলের নতুন মডেল, ড্রাইভিং রেঞ্জ, উন্নত পারফরম্যান্স এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইভি বিক্রিতে অর্জিত হয়েছে রেকর্ড উচ্চতা
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ায়- আন্তর্জাতিক শক্তি এজেন্সি (IEA) পূর্বাভাস জানিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে সমগ্র পৃথিবীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশে বৈদ্যুতিক যানবাহন পৌঁছে যাবে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের দুনিয়ায় পরিবর্তন পরিবেশবান্ধব এনার্জির দিকে ঝুঁকছে যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক শক্তি এজেন্সির (IEA) মতে, সড়ক পরিবহন বিশ্বব্যাপী শক্তির উৎসের ছয় ভাগের এক ভাগ বৈশ্বিক বায়ু দূষণের জন্য দায়ী। তবে ইলেকট্রিক ভেহিকেল এই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এ বছরের ইভি সম্পর্কে গুটিকয়েক তথ্য তুলে ধরা হলো। যার অধিকাংশ তথ্য প্রদান করেছে- কনসালটেন্সি ফার্ম Rho Motion।
ইলেকট্রিক ভেহিকেল কেমন বিক্রি হয়েছে?
বিশ্বব্যাপী ইভি বাজার, যার মধ্যে রয়েছে পিওর ইভি এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড, ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তার আগের বছরের তুলনায় বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। Rho Motion-এর হিসাব মতে, ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১৫.২ মিলিয়ন বৈদ্যুতিক যানবাহন বিক্রি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক শক্তি এজেন্সি আশা করছে, ইলেকট্রিক যানবাহনের বিক্রি আগামীতে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশে পৌঁছে যাবে। এর বেশির ভাগ চীনে বিক্রি হবে।
কোথায় বেড়েছে ইভির শেয়ার?
Rho Motion-এর তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকো ২০২৪ সালে তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি বৈদ্যুতিক যানবাহন বিক্রি করেছে, যার বেশির ভাগই এসেছে চীনের শক্তিশালী অটোমেকার প্রতিষ্ঠান BYD থেকে। যেহেতু চীনের জনসংখ্যা অনেক বেশি, সেখানকার ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে মেক্সিকোর পাঁচ গুণ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি ইলেকট্রিক ভেহিকেল বিক্রি হয়েছে। এ তালিকায় অন্য উল্লেখযোগ্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- যুক্তরাজ্য, যেখানে বছরের শুরু থেকে ইভির বিক্রি প্রায় ১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ইউরোপের অন্য রাষ্ট্র ফ্রান্স এবং জার্মানির সঙ্গে তুলনা করার মতো, তবে সেখানে বিক্রি কমেছে। অন্যদিকে তুরস্কে, ইলেকট্রিক ভেহিকেলের বাজার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ। এর প্রধান কারণ টেসলার বাজারে প্রবেশ এবং তুর্কি অটোমেকার প্রতিষ্ঠান Togg-এর বিক্রি বেড়ে যাওয়া। নরওয়ে, বছরের পর বছর ইলেকট্রিক গাড়ির শেয়ারের দিক থেকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে, সেখানে ৯০ শতাংশ নতুন গাড়ি ছিল বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইলেকট্রিক ভেহিকেল)।
বিশ্বব্যাপী এবং যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিন যানবাহনের নাম কী?
Rho Motion-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এবং যুক্তরাষ্ট্রে সেরা বিক্রি হওয়া পূর্ণ বৈদ্যুতিক যানবাহনটি হলো- ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলার মডেল ওয়াই, এরপরই রয়েছে টেসলার মডেল ৩-এর অবস্থান। টেসলার মডেল ওয়াই SUV ২০২০ সালে মুক্তি পায়। এর বেস ভার্সনটির মূল্য বর্তমানে প্রায় ৪৫ হাজার ডলার। আর মডেল ৩ মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। এর সবচেয়ে কম দামের ভার্সনটির দাম প্রায় ৪২ হাজার ডলার। দুটি মডেলই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৭,৫০০ ডলারের ট্যাক্স ক্রেডিট অর্জন করে।
টেসলার শেয়ার পরিবর্তিত হচ্ছে কি?
Rho Motion-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী টেসলার বৈদ্যুতিক যানবাহনের শেয়ার ছিল প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে, অক্টোবর পর্যন্ত টেসলার শেয়ার ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। এর মানে, তারা এখনো ইলেকট্রিক ভেহিকেলের বাজারে সবচেয়ে বড় শেয়ার হোল্ডার। তবে অন্য অটোমেকাররা পিছিয়ে নেই। তারাও সাশ্রয়ী দামে এবং নানা ক্যাটাগরির বৈদ্যুতিক যানবাহন বিক্রি করে টেসলার দীর্ঘদিনের নেতৃত্বে সামান্য হলেও প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ- জিএম, ফোর্ড, হোন্ডা এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বাজারে নিয়ে এসেছে সাশ্রয়ী মূল্য এবং ভিন্ন ভিন্ন সাইজের বৈদ্যুতিক যানবাহন, যা টেসলার শেয়ার কমাচ্ছে। যদিও টেসলা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মূল্যের অটোমেকার, যার বাজারমূল্য ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
তথ্যসূত্র : অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি)