শীত বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। চারদিকে এখন বসন্তের রং। মন পাাগল করা কোকিলের ডাক আর বাহারি ফুলের নূপুর পরে প্রকৃতি সেজেছে বর্ণিল সাজে। শীতের জড়তা ঝেড়ে ফেলে গাছে গাছে গজিয়েছে কচি নরম পাতা। মরা গাছে ফুল ফুটেছে। প্রকৃতির এমন প্রাণোচ্ছ্বাসে মোমিনের আনন্দ দ্বিগুণ করতে এসেছে রমজান। আলহামদুলিল্লাহ! দীর্ঘ অপেক্ষার পর আল্লাহতায়ালা আমাদের রমজান পর্যন্ত এনেছেন। প্রথম তারাবি ও প্রথম সাহরি খেয়ে এখন আমরা অপেক্ষা করছি প্রথম ইফতারের জন্য। হাদিস শরিফ থেকে জানা যায়, রমজানের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রহমতের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়। কবরবাসীর শাস্তি এক মাসের জন্য মাফ করে দেন আল্লাহতায়ালা। হাদিসের এই কথা যে কত বাস্তব, কত প্রাণবন্ত আজকের এদিন এই সকাল তার বড় প্রমাণ।
গতকাল আসরের জামাতেও মসজিদগুলো ছিল মুসল্লিশূন্য। যখনই পশ্চিম আকাশে মাহে রমজানের বাঁকা চাঁদ উঁকি দিয়েছে, হাদিসের ভাষায় রহমতের দুয়ার খোলা হয়েছে, হঠাৎ যেন কী হয়ে গেল। ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, আলেম-জালেম, ভালো-মন্দ, পাপী-তাপী এক কথায় প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে কে যেন এক আশ্চর্য পরিবর্তন এনে দিলেন। অন্য দিন আজান কখন শুরু হয় কখন শেষ হয়, খোঁজ রাখে না কেউই। গতকাল মাগরিবের থেকে আজানের আগেই মসজিগুলো ভরে যাওয়ার দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দিয়েছে আমাদের। রমজান ছাড়া অন্য কোনো সময়ে মসিজদের বাগানে এত মুসল্লিফুল ফুটতে আর কখনোই দেখা যায় না।
মূলত শবেবরাতের পর থেকেই মুসলমানদের মনে রমজানের হাওয়া বইতে শুরু করে। চারদিকে কেমন যেন রোজা আসছে আসছে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। শবেবরাতের পর এক দিন যায় তো পুরো মুসলিমবিশ্ব বলে ওঠে এক দিন এগিয়ে এলো মাহে রমজান। বিশ্বকণ্ঠের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির মুসলমরাও রমজানের প্রহর গুনেছে আনন্দের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে। দীর্ঘ অপেক্ষা আর আনন্দের প্রস্ততি শেষে এখন আমরা প্রথম রোজা পালন করছি। তাই আবারও আল্লাহর কদমে শোকরিয়ার সেজদা করে বলছি, আলহাদুলিল্লাহ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, রোজার মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা হয়। অন্যান্য মাসে সে যতটা বেপরোয়া হয়, যতটা স্বেচ্ছাচারী হয়, মাহে রমজানে তত বেশি বেপরোয়া সে হতে পারে না। একটি সীমানা আল্লাহতায়ালা তার জন্য বেঁধে দেন। তাই আমরা দেখতে পাই, রমজানের পুরোটা সময় পাপ-পঙ্কিলতা একেবারেই কমে যায়। অশ্লীলতা-বেহায়াপনা চোখে পড়ে না বললেই চলে। চারদিকে ভালো কাজ, নেক কাজের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। মানুষের আচার-ব্যবহার দেখলে মনে হয়, কোনো এক অলৌকিক জাদুরকাঠির ছোঁয়ায় বদলে গেছে তার ভিতর-বাহির। অপূর্ব ধৈর্য, সহনশীলতা, পরোপকারী মনোভাব, অন্যের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিটি দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় পুরো দেশ আল্লাহপাকের রহমতের সাগরে ভাসছে। মাহে রমজানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব স্তরের তরুণদের মনে ধর্মপ্রেম জেগে ওঠে। তারাবি-তাহাজ্জুদসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে তরুণদের উপস্থিতি এ দেশের ভবিষ্যৎ যে ইসলামের উর্বর ভূমি তাই দেখিয়ে দেয় চোখে আঙুল দিয়ে। তরুণীদের হিজাবের প্রবণতা আমদের মনে আশা জাগায় নতুন করে। টিভি-রেডিও, হাঁটবাজার, ঘরেবাইরে সবখানে শুধু কোরআন তেলাওয়াত আর তেলাওয়াত। চারদিকে সুমধুর তেলাওয়াত, তরজমার ধ্বনি বলে দেয় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম দেশে কোরআন নাজিলের মাস রমজান এসেছে। আজ থেকে পুরো এক মাস তারাবি, তাহাজ্জুদ, সাহরি ও ইফতারের মতো ইবাদতময় রুটিনের মধ্য দিয়ে আমরা সিয়াম পালন করব। যেমন পালন করেছিলেন আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মরা। উদ্দেশ্য একটাই- যেন আমরা মুত্তাকি হতে পারি। আল্লাহ বলেছেন, ‘ওহে বিশ্বাসীরা! তোমাদের ওপর সিয়াম সাধনা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত-১৮৩।) তো আমরা যদি মুত্তাকি হতে না পারি, তাহলে নিশ্চিত ধরে নিন, আমাদের পুরো পরিশ্রমই বৃথা গেল। আমাদের সিয়াম-কিয়াম, সাহরি-ইফতার সবকিছুই প শ্রম হলো। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিন! রমজানের এক মাস আমাদের জীবন যেমন নেকের ছোঁয়ায় কাটবে, আগামী ১১টি মাসও এভাবেই আমরা নেকের জিন্দেগির চর্চা করে নেকবান্দা হয়ে থাকব। তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে। আমরা হতে পারব কোরআনে আঁকা সত্যিকারের মুত্তাকি।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর, www.selimazadi.com