প্রায় ১০ বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার লুটের ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতভর বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ১৬২৩ মার্কিন ডলার অর্থাৎ ১০১ মিলিয়ন হ্যাক করে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। বিষয়টি জানাজানি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই বছরের ১৫ মার্চ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মতিঝিল থানায় মামলা করে। এরপর তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শুরু করে। কারও নাম উল্লেখ না করে ফৌজদারি দন্ডবিধির ১৭৯ (চুরির অপরাধ) ধারাসহ ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪ ধারা এবং ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের ৫৪ ধারায় মামলাটি করা হয়। যা ছিল হ্যাকিং ও রিজার্ভ লুটের ঘটনায় বড় ধরনের ঘাটতি।
জানা গেছে, ৭ জানুয়ারি মামলাটির তদন্তভার চেয়ে সিআইডিকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে সিআইডি এখনো সেই চিঠির জবাব কিংবা তদন্তভার হস্তান্তর করেনি। সংস্থাটি এর তদন্ত দুদকে পাঠিয়ে দেবে কি না, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। এদিকে দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সিআইডির তদন্ত ছিল এখতিয়ারবহির্ভূত। ২০০৪ সালের দুদকের আইন অনুযায়ী এ তদন্ত কেবল দুদক করারই অধিকার রাখে। দুদক সূত্র জানায়, মামলায় চুরির ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। হ্যাকিংয়ের কোনো ধারা যুক্ত করা হয়নি। চীনে বসে হ্যাকার ঘটনা ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং টাকা নগদায়ন করেছে ফিলিপাইনে। এখানে চুরির কোনো বিষয়ই নেই। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় পরিকল্পিতভাবে এই ধারায় মামলা করেছিল। কারণ যাতে মামলাটির তদন্ত সিআইডিতে যায়। আর সিআইডিতে যাওয়াতে তদন্ত কার্যক্রম তারা গত ১০ বছরের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু রিজার্ভ চুরিতে যখন ব্যাংক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে তখন তা দুদকের এখতিয়ারে চলে আসে। ফলে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ১০-১২ জন সাবেক ও বর্তমান জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে তদন্তের আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে একজন নির্বাহী পরিচালক, একজন মহাব্যবস্থাপক, চারজন যুগ্ম পরিচালক, তিনজন উপমহাব্যবস্থাপক এবং দুইজন উপপরিচালক রয়েছেন। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে করা মামলাটির বাদী ছিলেন উপপরিচালক জুবায়ের বিন হুদা। তারও ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের জন্য ব্যবহৃত সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (এসডব্লিউআইএফটি) সার্ভার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সিস্টেম। তারপরও তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান এই সার্ভারের সঙ্গে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেম সংযুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা এই সিদ্ধান্তকে অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করেছেন। আরটিজিএস এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহার মধ্যস্থতায় হ্যাকিংয়ের প্রথম অধ্যায়ে আরটিজিএস প্রকল্প আনা হয়। হ্যাকারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সুইফটের অ্যাক্সেস। পরিকল্পনামতো আরটিজিএস সংযোগ স্থাপনের জন্য ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নানকে ভাড়া করে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ে আসেন আতিউর। আরটিজিএস স্থাপনের পর নীলা ভান্নান বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টারনেটের সঙ্গে সুইফটের সংযোগ স্থাপন করে দেন। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই আংশিক (ছায়া) তদন্ত করেছিল। তারা জানিয়েছিল, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এত বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের ঘটনা তদন্তে রাষ্ট্র সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে দিয়ে তদন্ত করায়। ওই তদন্ত প্রতিবেদন ২০১৮ সালের ২০ মার্চ জমা দেওয়া হয়। কিন্তু তা প্রকাশ করা হয়। সূত্র জানায়, রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করা গেলেও আদালতে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে পারেনি সিআইডি। এ পর্যন্ত আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় পিছিয়েছে ৭৯ বার। মামলাটির প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন অতিরিক্ত এসপি (বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি) রায়হান উদ্দিন খান ৮ বছরেও আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করেননি। তিনি হ্যাকারদের তথ্য চেয়েও ভারত, চীন, জাপানে কোনো চিঠিও পাঠাননি। তবে তাকে আতিউর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে শুধু হ্যাকার ও বিদেশি কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দিতে চাপ দেন সিআইডির তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া। তার কথা অনুযায়ী কাজ না করায় রায়হান উদ্দিন খানকে পরে বদলি করে দেওয়া হয়। সিআইডি সূত্র জানায়, পরবর্তী সময়ে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তৎকালীন অতিরিক্ত এসপি (বর্তমানে এসপি) আবদুল্লাহ আল ইয়াছিনকে। এরপর গত বছর সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে আলামত পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। পরীক্ষায় হ্যাকিং প্রমাণিত হওয়ার ৬৩৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দেয় ফরেনসিক বিভাগ। গভর্নর আতিউর ও তার সহযোগীদের রক্ষায় মামলায়ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়। তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি মামলার ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ করে। তারা দেখতে পান, আর্থিকভাবে সুবিধা পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএসের সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক দুর্বৃত্ত ও হ্যাকারদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। দুদক বলছে, এসব অপরাধ দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ। ফলে দুদকের পক্ষ থেকে সিআইডির কাছে পুরো মামলার কেস-ডকেট (ফাইল) চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।