দেশের বেসরকারি খাতের সব বিদ্যুৎ প্রকল্পে এতদিন ‘বাস্তবায়ন চুক্তি’ বা ‘ইমপ্লিমেন্ট এগ্রিমেন্ট (আইএ)’ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে বিদ্যুৎ খাতে এই নীতির পরিবর্তন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সম্প্রতি ১০টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আহ্বান করা দরপত্রে এটি বাতিল করা হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে সব ধরনের বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে এ খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির শঙ্কা বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রাহক পর্যায়ে বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসানও বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাস্তবায়ন চুক্তি বাতিল প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার এ দায়িত্ব আর নিতে পারছে না। আমরা আইপিপিগুলোকে টাকা দিতে পারছি না। সরকারের যে সার্বভৌম গ্যারান্টির প্রতিশ্রুতি তার মূল্য তো থাকতে হবে। আমরা এখন থেকে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেব না- যা সরকার রাখতে পারবে না। জানা যায়, বিদ্যুৎ প্রকল্পে ‘বাস্তবায়ন চুক্তি বা ইমপ্লিমেন্ট এগ্রিমেন্ট (আইএ)’-কে বিনিয়োগের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌম গ্যারান্টির মতো বা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) সম্পূরক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইএ থাকার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পায়। আর বাস্তবায়নকারী কোম্পানি স্বল্প সুদে ঋণসহ দাতা সংস্থা থেকে বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকে। এ কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কম হয়। দামও কম থাকে। ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) সম্পূরক চুক্তি হিসেবে আইএ করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে যতগুলো বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে- তার সবগুলোতেই আইএ ছিল। খাতসংশ্লিষ্টরা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএ বাতিল হওয়ার কারণে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাধাগ্রস্ত হবে এবং বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এরই মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন যে, আইএ না থাকার কারণে এ খাতে তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এই চুক্তি বাতিল হলে তারা আর বিনিয়োগে যাবেন না বলেও জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিনিয়োগকে তারা আর নিরাপদ মনে করছেন না, একে ঝুঁকি মনে করছেন। এ ছাড়া এটি বাতিল হলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোও সক্ষমতা বিবেচনায় ঋণ সহায়তা দেবে না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে বাস্তবায়নকারী কোম্পানির ব্যয় বেড়ে যাবে। এ বাড়তি ব্যয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে যোগ হয়ে গ্রাহকের কাঁধে পড়বে। বাড়বে শিল্প খাতের উৎপাদন খরচও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএ বিধান বাদ দেওয়ার কারণে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সময়ই বিনিয়োগকারীদের ব্যয় বেশি দেখাবে। ফলে যে কোম্পানিই কাজ পাক না কেন- দাম বেশি হবেই। এর ফলে বিপাকে পড়বে পিডিবি। বেশি দাম দিয়ে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে হবে। এতে লোকসান বাড়বে, ভর্তুকিও বাড়বে।
জানা যায়, পিডিবি গত বছরের ৫ ডিসেম্বর আইএ বিধান ছাড়া ৩২৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১২টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে। পরে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও ১০টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্র অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও চালু হওয়ার পর সরকার ২০ বছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট দামে বিদ্যুৎ কিনতে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষর করবে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং বিশেষজ্ঞরা। গত ৭ জানুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের সঙ্গে এক বৈঠকে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানান তারা। বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি সূত্র জানায়, আইএ বাতিল করায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ খাতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর জন্য ডাকা দরপত্রে দেশিবিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের অংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বেসরকারি উদ্যোক্তরা।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপা) সভাপতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এর মাধ্যমে সরকার খুব বেশি লাভবান হবে না। আবার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের একেকবার একেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি নেতিবাচক বার্তা দেবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাবে।
বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিউনিয়েবেল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বলেন, মোস্তফা আল মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার চাইলেও তাদের কাজ ও কথার মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিকভাবে একটি পরিচিত ব্যবস্থা হচ্ছে আইএ ও পিপিএ। বিনিয়োগকারীরাও এর সঙ্গে পরিচিত এবং অভ্যস্ত। এরই মধ্যে ৪০টি কোম্পানি এ খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিশ্চিত করে এর ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ফেলেছে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলো রিভিজিট না করে দায়িত্বপ্রাপ্তরা অন্য ব্যবস্থায় চলে যান। আমরা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বারবার বসছি কিন্তু তারা আইএ না থাকলে এ খাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। আইএ বাতিল হলে তারা আর বিনিয়োগে যাবেন না বলেও জানিয়েছেন। তারা এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা নিরাপদ মনে করছেন না। এ মুহূর্তে বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া এতবড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না।