অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আশাব্যঞ্জক ভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে গত সাত মাসে প্রতিবেশী দেশ ভারতে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশটিতে রপ্তানি কমেছিল। রপ্তানিকারকরা মনে করেন, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির উন্নতি এবং চাহিদা বৃদ্ধির ফলে প্রতিবেশী দেশে পোশাকের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা বলেন, অনেক পশ্চিমা ব্র্যান্ড ভারতে তাদের শোরুম চালু করেছে এবং তারা বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পোশাক আমদানি করছে। একই সঙ্গে ভারতেরও চাহিদা বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ভারতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৪২ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার (৪২৭ মিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে ১৪ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের নিটওয়্যার পোশাক এবং ২৭ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ভারত থেকে পোশাক রপ্তানি আয় ছিল ৩৬ কোটি ২৬ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতে পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৫৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৬৮ কোটি ৩৪ লাখ ৭০ হাজার ডলারের চেয়ে ১৯ দশমিক ৭০ শতাংশ কম। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত অর্থবছরে ভারতের সামগ্রিক আমদানি কম ছিল। কারণ দেশটি স্থানীয় উৎপাদনের দিকে বেশি মনোনিবেশ করছে। এ ছাড়াও মুদ্রা সমস্যার কারণে তাদের জন্য আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্বব্যাপী চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গত দুই অর্থবছরে হ্রাস সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে ভারতে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। অনেক মার্কিন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোম্পানি ভারতের বাজারে তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করছে। তারা ভারতের জন্য তাদের দোকানে পণ্য সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির উন্নতিকে অনুসরণ করে। চট্টগ্রামের ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভারত বৈশ্বিক বাজার বাড়ানোর লক্ষ্যে রপ্তানিতে বেশি মনোনিবেশ করেছে এবং এটি স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোকে আবার বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে আমদানি করার দিকে বাধ্য করছে।
তবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণকে ভারতে পোশাক রপ্তানি কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা উচিত এবং বিদ্যমান বাণিজ্যিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করা উচিত। উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় অপ্রচলিত বাজারগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোচনা শুরু করা উচিত।
প্রচলিত বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কানাডার মতো পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে উচ্চ আমদানি শুল্কের সম্মুখীন হতে পারে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী ভারতে পোশাক রপ্তানিতে ২০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে পারে। উচ্চ শুল্কের কারণে ভারত এবং জাপানে পোশাক রপ্তানির ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে এবং উত্তরণের পর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি প্রাথমিকভাবে হ্রাস পাবে। একাধিক রপ্তানিকারক মনে করেন, যেহেতু গত দশকে অর্থনৈতিক সূচকগুলো অতিরিক্ত ছিল এবং অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এজন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। তারা বলেন, সরকারকে ক্রেতাদের কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করার জন্য উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করা উচিত। কারণ শুল্কমুক্ত বাজারের প্রবেশাধিকার সুবিধার ফলে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। অপ্রতুল অবকাঠামো, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা, ধীর কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং খারাপ লজিস্টিকের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসার খরচ অত্যন্ত বেশি, যা সম্মিলিতভাবে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয় এবং বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, উত্তরণের পরে শুল্ক সুবিধা বজায় রাখতে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশি পোশাকের জন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া প্রধান অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার কথা উল্লেখ করেন। যদি সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখার জন্য ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে ভারতে রপ্তানি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।