রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালে দেশের স্টার্টআপগুলোতে নতুন বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। বাংলাদেশ স্টার্টআপ বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৪ : পর্যালোচনা বছর শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে ৪ কোটি ১৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যা ২০২৩ সালে ছিল ৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা পরামর্শ সংস্থা লাইটক্যাসল পাটনার্স এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। স্টার্টআপ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় তহবিল সংস্থা বাংলাদেশ স্টার্টআপ লিমিটেডসহ সব অংশীজন থেকে নেওয়া তথ্য এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদহার বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী ভেঞ্চার ক্যাপিটালের নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের নিম্নমুখী প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও একই ধরন প্রতিফলিত হয়েছে। তাই দেশীয় তহবিল এবং প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তহবিল পাওয়ার চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম সক্রিয় ছিল এবং ৩৭টি চুক্তিতে মোট ৪ কোটি ১৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অব্যাহত রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট বিনিয়োগের ৯৮ শতাংশ বা ৪ কোটি ৩ লাখ ডলার আসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। দেশি বিনিয়োগ কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলেও এটি এখনো মোট তহবিলের একটি ছোট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। যা দেশি উদ্যোগগুলোর বিদেশি বিনিয়োগের ওপর চলমান নির্ভরতা তুলে ধরে। তারপরও দেশি উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপ বিনিয়োগে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ রয়েছে বলে প্রতিবেদন বলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লজিস্টিক এবং চলমান কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ পেয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। আর্থিক পরিষেবা খাতের কোম্পানিগুলো ৭৭ লাখ ডলার, ভ্রমণ এবং পর্যটন খাতের কোম্পানি ৬৪ লাখ ডলার, সফটওয়্যার, প্রযুক্তি এবং এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন কোম্পানিগুলো পেয়েছে ৩৪ লাখ ডলার, ই-কমার্স এবং খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ৩২ লাখ ডলার, শিক্ষা ২৭ লাখ ডলার এবং জ্বালানি ও জলবায়ুতে ২২ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাঠাও, শেয়ার ট্রিপ, শিখো, শপআপ, আরোগ্য এবং ফসলের মতো কোম্পানিগুলোতে ৯৪ শতাংশের বেশি ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে। অন্যান্য উদ্যোগের চেয়ে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ বেশি হওয়াই ইকোসিস্টেমের চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের অবস্থানকে নির্দেশ করে। মোট তহবিলের ২ দশমিক ৬ শতাংশ বা ১১ লাখ ডলার ছিল অ্যাঙ্গেল বিনিয়োগকারীদের অবদান। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) তহবিল সাধারণত মূলধনের বিনিময়ে উচ্চ-প্রবৃদ্ধির স্টার্টআপগুলোর জন্য বড় সংস্থাগুলো থেকে আসে। অন্যদিকে অ্যাঙ্গেল বিনিয়োগকারীরা হলেন এমন ব্যক্তি যারা নমনীয় শর্তাবলিসহ স্টার্টআপগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট চুক্তির ২২টি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল পেয়েছে যেখানে অ্যাঙ্গেলরা মাত্র চারটিতে তহবিল দিয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশ আগামী বছরগুলোতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পেতে পারে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রণোদনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে স্থানীয় বিনিয়োগ অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা অপরিহার্য, বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মিশ্র অর্থায়ন, উদ্যোগ ঋণ এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)-সহ তহবিল চ্যানেল সম্প্রসারণ আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করতে পারে। অধিকন্তু ফিনটেক, লজিস্টিকস এবং সফটওয়্যার-চালিত উদ্ভাবনের মতো উচ্চ-প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।