স্বল্পমূল্যে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে দেশের ৮ লাখ ফার্মেসি ও দোকানে এসএমসির পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীদের প্রায় অর্ধেকই এসএমসি ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করেন
বৃহত্তম সামাজিক বিপণন প্রতিষ্ঠান সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাই। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পথচলার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। তছলিম উদ্দিন খান বলেন, জনস্বাস্থ্যের যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রের উন্নয়নে কাজ করবে এসএমসি। আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও কিশোরীদের ৫০ শতাংশের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের কম বয়সে। এদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ গর্ভবতী হচ্ছেন ২০ বছরের নিচে। এই বয়সে তারা গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত নয়। ফলে একটা শিশুর মধ্যে জন্ম নেয় আরেকটি শিশু। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা এই অবস্থা দূর করতে চাই। আমরা দেখতে চাই না কিশোরীদের বিয়ে এবং মা হওয়া।
তিনি বলেন, প্রত্যেক মায়ের চারটি প্রসব-পূর্ব সেবা পাওয়া উচিত ৪, ৬, ৮ এবং ৯ মাসের সময়। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন গর্ভবতী এই সেবা পাচ্ছেন, যারা পাচ্ছেন না তারা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এ কারণেই বছরে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মাতৃমুত্যু হয়। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মা হওয়ার আনন্দ বিষাদে পরিণত হোক এটা কাম্য না। এজন্য আমরা মাতৃমৃত্যু কমাতে চাই, প্রসব-পূর্ব সেবা বাড়াতে চাই। এসএমসির এমডি বলেন, গ্রামে এখনো ৩৫ শতাংশ প্রসব হয় বাড়িতে। এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখন কোনো জটিলতা দেখা দিলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সময়ই মা মারা যান। ঝুঁকি চিহ্নিত করার মাধ্যমে আমরা এসব মৃত্যু কমাতে চাই। দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারীদের ভিটামিন ডি-এর অভাব রয়েছে। ৪৪ শতাংশ নারীর জিংক, ২৮ শতাংশের আয়রন, ৩০ শতাংশের আয়োডেনির অভাব রয়েছে। এসব ঘাটটিতে থাকার ফলে জন্ম দেওয়া সন্তানের ওজন কম হয়, ঝুঁকি বেশি থাকে। মা ও পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের নিউট্রিশন ঘাটতি পূরণ করতে চাই। না হলে শিশুরা ঠিকমতো গড়ে উঠবে না। পরিবার পরিকল্পনা সেবার পাশাপাশি উল্লিখিত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাই।
তছলিম উদ্দিন বলেন, দেশে যত ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণের খাবার বড়ি ফার্মেসিতে পাওয়া যায় তার ৯০ শতাংশ এসএমসির। জাতীয় কর্মসূচিতেও ৪৮ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সরবরাহ করে এসএমসি। মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে কীভাবে মানুষের কাছে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া মোটাদাগে চ্যালেঞ্জ ছিল। এসএমসির সব নতুন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রেও এই চ্যালেঞ্জগুলো সামনে চলে আসে। ১৯৭৫ সালে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। শুরুর পথটা এতটা মসৃণ ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশ একটা ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ছিল। প্রথমেই আমরা দেখতে পেলাম জনসংখ্যা সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের কাজটা শুরু করে এসএমসি। ওই সময় পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারী ছিল ১০ শতাংশেরও কম। এটা বর্তমানে ৬৪ শতাংশ। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীদের প্রায় অর্ধেকই এসএমসি ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এভাবেই আমরা সরকারের পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে সহায়তা করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আজ থেকে ২৫ বছর আগেও ৫ বছরের কম বয়সি শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল ডায়রিয়া। মৃত্যু কমানো সম্ভব হয়েছে এসএমসির ওরস্যালাইনের কারণে। দেশের ৪০ শতাংশের মতো নারী এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। সারা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোরীদের কাছে আমরা স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন জয়া পৌঁছে দিচ্ছি। এজন্য ৫টি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করছে এসএমসি। গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে এসএমসি ব্লু স্টার নেটওয়ার্কের প্রায় ১৩ হাজার কর্মী। দেশের ৪০ শতাংশের মতো ইনজেটেবল সেবা তাদের মাধ্যমেই দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের গ্রোথ মনিটরিং, গর্ভবতী মায়ের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা সেবাও প্রদান করেন। এ ছাড়াও গ্রিন স্টার, গোল্ড স্টার, পিংক স্টার ও রোজ স্টার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেবা প্রদান করছে এসএমসি।
এসএমসির এমডি বলেন, স্বল্পমূল্যে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে সারা দেশের ৮ লাখ ফার্মেসি ও দোকানে এসএমসির পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ থেকে ৫০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পপুলেশন সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ সরকার এবং ইএসএআইডি সোশ্যাল মার্কেটিং প্রজেক্ট শুরু করে। এই প্রকল্প সফলতার সঙ্গে দীর্ঘদিন চলার পরে ১৯৯০ সালে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু ইএসএআইডি এখনো আমাদের সহযোগিতা করছে, তার জন্য ইউএসএআইডির কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালে এসএমসি এন্টারপ্রাইজের যাত্রা শুরু হয়। তারা যে মুনাফা করে তার একটা বড় অংশ আবার বিনিয়োগ করা হয় এসএমসির স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে।