বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। সারা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ যা আমদানি করে তার ২৮ ভাগের বেশি আসে চীন থেকে। বিপরীতে সারা বিশ্বে যা রপ্তানি করে বাংলাদেশ, তার মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি যায় চীনে। আকাশসম এ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবার চীনা বিনিয়োগ টানার কৌশল নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আজ সকালে বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা। এ ছাড়া চীনের উদ্যোক্তা, শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব বৈঠক থেকেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ চীন নতুন বাণিজ্যের রূপরেখা।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করতে চায়, যেখানে চীনের বিনিয়োগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ যে লাভজনক সেটিই তুলে ধরা হবে দেশটির উদ্যোক্তাদের সামনে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, চায়না সফরটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা মাইলফলক ভিজিট। ২৮ মার্চ (আজ) সকালে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ফোকাস থাকবে, চাইনিজ ইনভেস্টর, চাইনিজ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলো, চাইনিজ এনার্জি কোম্পানিগুলো, চায়নার টপ যে কোম্পানিগুলো আছে তাদের সঙ্গে কথা বলা।
যে কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াবে চীন : স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পায়। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে গেলেও আরও তিন বছর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ। চীনের উদ্যোক্তারা যদি বাংলাদেশে শিল্প স্থানান্তর করে এ দেশে পণ্য উৎপাদন করে, তবে সেই পণ্য শুল্ক সুবিধায় উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি করতে পারবে। এ বিষয়টি চীনের উদ্যোক্তাদের সামনে তুলে ধরবেন প্রধান উপদেষ্টা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ যে এ অঞ্চলের শিল্প হাব হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম-চীনকে সেটিই বোঝানো হবে। চীনকে আরও বোঝানো হবে, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরসহ বাংলাদেশের রয়েছে একাধিক বন্দর যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দ্রুততম করার জন্য সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; যার সুযোগ নিতে পারে চীন। এ ছাড়া চীনা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে প্রস্তাবিত চায়নিজ ইকোনমিক জোনের কাজ দ্রুততম সময়ে শুরু করার প্রস্তুতির কথাও জানানো হবে। এই অর্থনৈতিক জোনের কাজ চলতি বছরই শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
সেবা খাতে নতুন বিনিয়োগে নজর : প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে, কৃষি, আইসিটি, হাইটেক পার্ক, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল, চামড়া এবং সোলার (সৌর বিদ্যুৎ)সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ছাড়াও ব্যাংক-বীমা তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো সেবা খাতেও তারা কৌশলগত বিনিয়োগে আসতে চায়। বিগত সরকারের সময় এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় কোনো চুক্তি না থাকায় চীনা বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি। এই বিনিয়োগ সুরক্ষা দিতেই এবার প্রধান উপদেষ্টার সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়তা নিয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
সেমি কন্ডাক্টর, সৌর প্যানেল, ই-কমার্স শিল্পে আসতে পারে জায়ান্ট কোম্পানি : বাংলাদেশ থেকে আম, কাঁঠাল ও পেয়ারাসহ কৃষিপণ্য আমদানি করতে চায় চীন। তবে এসব কৃষিপণ্য মৌসুমি ফল বলে সারা বছর রপ্তানি করা যাবে না। এ ছাড়া এসব পণ্য রপ্তানি করে খুব বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাবে না। এ কারণে বাংলাদেশ চাইছে চীনে রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে এমন শিল্পে দেশটির যৌথ বিনিয়োগ আনতে। যৌথ বিনিয়োগে উৎপাদিত পণ্য আবার চীনে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে চীনে ৯৯ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ২০২৬ সালে এই সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও শুল্ক সুবিধা আরও দুই বছর অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে চীন। তবে এই সুবিধা ততটা কার্যকর নয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাত বাদে অন্যান্য খাতে চীনা বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। সে কারণে বাংলাদেশ চাইছে পোশাক খাতের বাইরে সম্ভাবনাময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স গুডস, হাইটেক পার্ক-বিশেষ করে সেমি কন্ডাক্টর উৎপাদনে চীনা বিনিয়োগ টানতে। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তাবিত চায়নিজ ইকোনমিক জোন অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রস্তুত করার আশ্বাস দেওয়া হবে। বাংলাদেশের ১৮ কোটি ভোক্তার বাজার ধরতে ই-কমার্স খাতেও আসতে পারে চীনের জায়ান্ট কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাণিজ্যে বিনিয়োগ করেছে চীনের মালিকানাধীন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। আরও একাধিক বড় প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সেমি কন্ডাক্টরের বিপুল চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি যদি বাংলাদেশের হাইটেক পার্কে এনে সেমি কন্ডাক্টর উৎপাদনে যেতে পারে- তবে দেশের রপ্তানি আয় এই এক খাত থেকেই কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়ানো সম্ভব। সে কারণে চীন সফরের শুরুতেই গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তৈরি পোশাক, বৈদ্যুতিক যানবাহন, হালকা যন্ত্রপাতি, উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রনিক চিপ উৎপাদন এবং সৌর প্যানেল শিল্পসহ চীনা উৎপাদন শিল্পের স্থানান্তর সহজতর করতে বেইজিংয়ের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।