চার দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। গতকাল বিকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মহাসচিবকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। সাত বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে এটি তাঁর দ্বিতীয় সফর। সফরকালে চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় তিনি মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা ১ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতারে অংশ নেবেন, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত থাকবেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরে আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট। এ ছাড়া মানবাধিকার ইস্যুও গুরুত্ব পাবে বলে বার্তা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরসূচি তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। তিনি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব গতকাল বিকালে ঢাকা আসেন। ১৬ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানের মধ্যে তাঁর সফরের প্রধান কর্মসূচি শুক্র ও শনিবার। শুক্রবার তিনি প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। একই দিনে প্রধান উপদেষ্টাসহ জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে কক্সবাজার যাবেন। কক্সবাজারে প্রধান উপদেষ্টার আলাদা কিছু কর্মসূচি আছে। তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরের একটি প্রকল্প উদ্বোধন করবেন এবং একটি জলবায়ু উদ্বাস্তু কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি একটি মডেল মসজিদেরও উদ্বোধন করবেন।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব কক্সবাজারে নেমে সরাসরি চলে যাবেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। যেখানে তিনি একটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে ক্যাম্পেইন এবং রোহিঙ্গাদের পুষ্টি ও সহায়তার বিষয় নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন শুনবেন। এরপর রোহিঙ্গা কালচারাল সেন্টারে গিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখবেন। এ ছাড়া তিনি কক্সবাজারের একটি লার্নিং সেন্টার পরিদর্শন করবেন। এসব অনুষ্ঠান শেষে জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করবেন, যেখানে প্রধান উপদেষ্টাও উপস্থিত থাকবেন। আমরা আশা করছি, ১ লাখ রোহিঙ্গা এই ইফতারে অংশ নেবেন।
তিনি বলেন, ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টার সৌজন্যে। এটি রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ইউনিক এক্সপেরিয়েন্স হবে, যেখানে তাদের দুঃখ-কষ্টের মাঝে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। ইফতার শেষে তারা দুজনই কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরে আসবেন। পরদিন শনিবার মহাসচিব ঢাকায় জাতিসংঘের কার্যালয় পরিদর্শন করবেন। দুপুরে ঐকমত্য কমিশন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এরপর প্রধান উপদেষ্টার আয়োজনে ইফতার ও রাতের খাবার অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন অ্যান্তোনিও গুতেরেস। পরদিন তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যাবেন।
আজ কক্সবাজার যাচ্ছেন ড. ইউনূস ও গুতেরেস : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আজ কক্সবাজার আসছেন। বিশ্বের বৃহৎ আশ্রয় ক্যাম্প হিসেবে পরিচিতি পাওয়া উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে আসছেন এই দুই ভিভিআইপি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিন আজ ১৪ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও হেলিপ্যাড থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবেন। সাড়ে ১১টায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে স্বাগত জানাবেন উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক। এরপর কক্সবাজার শহর থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব যাবেন উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। বিকাল ৪টার দিকে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে উখিয়ায় পৌঁছাবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বিকালে দুজনই লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার আয়োজনে অংশগ্রহণ করবেন। সফরকালে গুতেরেস রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা, যুব প্রতিনিধি ও নারীদের সঙ্গে তিনটি পৃথক বৈঠকে অংশ নেবেন। ওইদিন বিকালে তিনি কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন। তবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম সফর।
রোহিঙ্গাদের মাঝে উচ্ছ্বাস : উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফর ঘিরে রোহিঙ্গাদের মাঝে বিরাজ করছে উচ্ছ্বাস-আনন্দ। এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে লাখো রোহিঙ্গাকে নিয়ে ইফতার করার স্থান। মেরামত করা হয়েছে রাস্তাঘাট আর নতুন করে সেজেছে পরিদর্শনের স্থানগুলো। লাখো রোহিঙ্গাকে নিয়ে ইফতার ঐতিহাসিক ঘটনা এবং রোহিঙ্গারা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
নতুন করেছে সেজেছে ক্যাম্প : উখিয়ার বর্ধিত ক্যাম্প-২০। চারপাশ অনেকটা পাহাড়বেষ্টিত। এখানেই লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করবেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে হেলিপ্যাডের কাছে একটি সেন্টারে রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক ও নারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরই মধ্যে জোন ভাগ করে রোহিঙ্গাদের বসার জন্য বিছানো হয়েছে ত্রিপল। তৈরি করা হয়েছে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র।
জাতিসংঘ মহাসচিব ১৮ নম্বর ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টার, রোহিঙ্গা সাংস্কৃতিক স্মৃতি কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সেবা এবং ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন।
আশ্রয়শিবিরে কার্যক্রমগুলোর তত্ত্বাবধান করছে সেনাবাহিনী। সঙ্গে রয়েছে পুলিশ, এপিবিএন, জেলা প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। কয়েক স্তরে নিরাপত্তাবলয় থাকবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।