ঘোষণা দিয়ে মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ‘মার্চ ফর খিলাফত’ স্লোগানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে পোস্টার সাঁটায় সংগঠনটি। গতকাল জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল বের করে হিযবুত তাহ্রীরের নেতা-কর্মীরা। পল্টন হয়ে বিজয়নগর পানির ট্যাংকি পর্যন্ত যাওয়ার পর পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া শুরু করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সেখান থেকে ধাওয়া দিয়ে পুলিশ অন্তত ৩০ জনকে আটক করে। সরেজমিন বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গতকাল জুমার নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিযবুত তাহ্রীরের নেতা-কর্মীরা মসজিদের উত্তর গেটে জড়ো হতে থাকে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা স্লোগান ধরে। একপর্যায়ে ব্যানার নিয়ে মিছিল বের করে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি পল্টন মোড় পার হয়ে বিজয়নগর মোড়ের দিকে এগোতে থাকে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মিছিলের আকার। প্রায় ৮ হাজার লোকের সেই মিছিলটি বিজয়নগর পানির ট্যাংকি পর্যন্ত পৌঁছামাত্র পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা ঢুকে পড়ে অলিগলিতে। কিছুক্ষণ পর তারা ফের সংগঠিত হয়ে পল্টন মোড়ের দিকে আসতে থাকে। পুলিশ এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। তখন মিছিলটি আবারও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বেলা আড়াইটার দিকে পল্টন ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। এ সময় হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য সন্দেহে অন্তত ৩০ জনকে আটক করে পুলিশের গাড়িতে তুলতে দেখা যায়। পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা অনেককে আমাদের হেফাজতে নিয়েছি। তবে তাদের সবাইকে আমরা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, আমরা যাচাইবাছাই করছি। যাদের সম্পৃক্ততা ছিল তাদের রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হবে। পল্টন থানার মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে। তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হিযবুতের মিছিল-পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে তাদের অনেকেই বলছিলেন, হিযবুতের মিছিলে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের অনেক সদস্য অংশ নিয়েছে। এটা তারা আগেই জানিয়েছিলেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে।
রাত থেকেই ছিল কড়া নিরাপত্তা : নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহ্রীরের ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে ও আশপাশের এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেন সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন শাখার সদস্যরা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, পল্টন মোড়ে প্রচুর পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা রয়েছেন। পল্টন মোড় থেকে গুলিস্তানমুখী সড়কে (সচিবালয়ের বিপরীত পাশের রাস্তায়) একটি সাঁজোয়া যান (এপিসি), একটি জলকামান ও একটি প্রিজন ভ্যানও দেখা গেছে। বায়তুল মোকাররম থেকে পল্টন মোড়মুখী সড়কে পুলিশের আরেকটি প্রিজন ভ্যান দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএমপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জননিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনায় নিয়ে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার হিযবুত তাহ্রীরকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ সংগঠনের যে কোনো ধরনের সমাবেশ, মিছিল, পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ বা প্রচারমূলক কার্যক্রম ফৌজদারি অপরাধ।
ডিএমপি আরও জানায়, হিযবুত তাহ্রীরসহ কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যদি সভা-সমাবেশ বা প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল দুপুরেও পুলিশ সদর দপ্তর সতর্কবার্তা দিয়েছে হিযবুতকে নিয়ে। সেই বার্তায় বলা হয়, হিযবুত তাহ্রীর একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন। আইন অনুযায়ী এদের সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ’।
উত্তরায় গ্রেপ্তার রিমান্ড : গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১২টার দিকে ঢাকার উত্তরা থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উত্তরা ১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেন- মনিরুল ইসলাম (৪০), মোহতাসিন বিল্লাহ (৪০) ও মাহমুদুল হাসান (২১)। পরে গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে মনিরুল ইসলামকে দুই দিন এবং মোহতাসিন বিল্লাহ ও মাহমুদুল হাসানকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মোহাম্মদ জোনাইদের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।