ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে আইন অনুযায়ী দেশ ও মানুষের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করতে জেলা প্রশাসকদের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, নিজের মতো করে যেটা আইন, যেটা দেশের জন্য করা দরকার, সেটা করতে হবে। কারও রক্তচক্ষু বা ধমক পরোয়া করার প্রয়োজন নেই। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও দেশের সব মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের শাপলা হলে তিন দিনব্যাপী ডিসি (জেলা প্রশাসক) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. ইউনূস এসব কথা বলেন। এসময় সরকারপ্রধান বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অহেতুক স্তুতি বা প্রশংসা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসকদের সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, সরকার দেশের সব মানুষের। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের সুরক্ষা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এখন থেকে আমাদের সব কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও দেশের সব মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। এখানে যেন আমরা কোনোভাবেই বিফল না হই। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকের সব ধরনের হয়রানি দূর করতে হবে। সরকারকে একটা ‘খেলার টিম’ অভিহিত করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এ সরকারের ছয় মাসকে আমি বলছি প্রথম পর্ব। প্রথম পর্বের কোনো ভুল থাকলে তা ঠিকঠাক করে এখন আমরা খেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন কাজ হলো কর্মপদ্ধতি ঠিক করা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, এটা আমাদের মস্তবড় দায়িত্ব। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে জেলা প্রশাসকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে- কার জেলায় বাজারদর কতটা ভালো নিয়ন্ত্রণে আছে।
অনলাইনে সেবা নিতে গেলেই সার্ভার ডাউন : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দুর্নীতিতেই শেষ এই জাতি। আমাদের অফুরন্ত সম্পদ আছে। সম্ভাবনা আছে। বিশ্ব জয় করার মতো তারুণ্য আছে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে কোনো সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অনলাইনে সেবা নিতে গেলে বলে সার্ভার ডাউন। কারণ দুর্নীতি করা যায় না। প্রতিটি কাঠামোর মধ্যে দুর্নীতি ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। এ দগদগে ঘা থেকে আমাদের যত শিগগিরই সম্ভব মুক্ত হতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের কোনোভাবেই সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই।
গতকাল বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনে সবার উদ্দেশে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা অল্প সময়ের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারে আছি। কতটুকু সমাধান দিতে পারব জানি না; তবে আসার পর থেকেই চেষ্টা করছি দুর্নীতি দূর করতে। দুর্নীতি প্রতিরোধের একটা চেষ্টা হলো অনলাইন সার্ভিস। সবকিছু তৈরি আছে, কিন্তু কাজে লাগাতে পারছি না। অনলাইনে ট্যাক্স দিতে গেলে বলে সার্ভার ডাউন। আরও কত সুন্দর সুন্দর ব্যাখ্যা! অর্থাৎ, আপনাকে সুযোগই দেবে না। একটা আছে ভূমি মন্ত্রণালয়। তারও সবকিছু (অনলাইন ব্যবস্থাপনা) প্রস্তুত আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও চায় আমরা দুর্নীতিমুক্ত হই। কারণ, দুর্নীতিমুক্ত না হলে তারা আমাদের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারছে না। কিন্তু আমরা সুযোগ দিতে চাই না। আমরা ব্যক্তিগত সুযোগ নিয়ে ব্যস্ত।
দুর্নীতি প্রতিরোধে সবাইকে প্রতিজ্ঞা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ (গতকাল) আমরা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে এসেছি। কোথায় কোথায় দুর্নীতি আছে তাদের অজানা নয়। সবার কাছে আবেদন করব, আমার থাকা অবস্থায় যেখানে অনলাইন ব্যবস্থা আছে, সেখানে যেন শতভাগ অনলাইন সার্ভিস চালু করতে পারি। আমরা থাকতে থাকতে করে ফেলেন। কেউ যেন এটা বাধা দিতে কোমর বেঁধে লেগে না যায়। দুর্নীতি থেকে বের হতে না পারলে সম্মান, উন্নতি কিছুই হবে না। আমরা যত বক্তৃতাই করি, সৎ জাতিতে পরিণত হতে না পারলে কোনো লাভ নেই। তিনি বলেন, দুর্নীতির গোড়া হলো সরকার। সরকার যদি দেশের উপকারে আসতে চায়, তাহলে দুর্নীতি থেকে দেশকে মুক্তি দিতে হবে। দেশের তরুণ সমাজকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীতে নার্স ও কেয়ারগিভারের বিপুল চাহিদা। কিন্তু আমরা সেই জনবল তৈরি করতে পারছি না। এখানে একজন নার্সের বিপরীতে তিনজন ডাক্তার। অথচ হওয়ার কথা উল্টো। যদিও এখানে নার্সিং কলেজ আছে, কিন্তু সেগুলোর মান প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটা নার্সিং কলেজ যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আপনি যত খুশি নার্স তৈরি করেন, অসুবিধা নেই। বিশ্বে নার্সের প্রচুর চাহিদা। আরেকটা চাহিদা আছে কেয়ারগিভার। মাত্র ছয় মাসের ট্রেনিং দিলে জাপান, ইউরোপ হাজারে হাজারে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমরা পারছি না। আমাদের সামনে বিশাল জগৎ। আমাদের সব সম্পদ আছে, সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি। এখন শুধু আমাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচিগুলো ঠিক করতে হবে। দুর্নীতি দূর করতে হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ।