বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেছেন, সত্যিকার অর্থে ব্যবসায়ীরা এ মুহূর্তে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকার এবং রাজনীতিবিদরা অর্থনৈতিক চ্যাপ্টারকে গুরুত্ব দিতে ভুলে গেছেন। তারা শুধু অন্যান্য ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। অর্থনীতির চাকা না ঘুরতে থাকলে ভবিষ্যতে যারা সরকার গঠন করবেন তারা অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারবেন না, এটা মনে রাখতে হবে।
গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিসিআইর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী, পরিচালক শহিদুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, এস এম শাহ আলম, জিয়া হায়দার, জাহাঙ্গীর আলম, রেহানা রহমান, শাহ আলম লিটু, নাজমুল আনোয়ার ও খায়ের মিয়া। বিসিআই সভাপতি বলেন, সুদহার বাড়ানো হচ্ছে, নতুন শিল্পের জন্য গ্যাসের দাম প্রতি ঘনফুট ৭৫ টাকা, আর বিদ্যমান শিল্পের জন্য গ্যাসের প্রতি ঘনফুটের দাম গত বছর দ্বিগুণ করা হয়েছে। হঠাৎ করে ভ্যাট দ্বিগুণ করা হলো, ঋণ শ্রেণিকরণের মেয়াদ ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাসে নিয়ে আসার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলো। আবার যখন উপদেষ্টা-গভর্নরের পক্ষ থেকে বলা হয়, দাম বাড়বে না, শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে না- এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য শিল্পোদ্যোক্তাদের খুবই চিন্তিত করে। এ অবস্থায় যদি দেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে ভয় পায়, তাহলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কীভাবে আসবে? আনোয়ারুল আলম চৌধুরী বলেন, আমরা ভেবেছিলাম সব ধরনের সংস্কার করার পাশাপাশি নিয়মিত অর্থনীতির চাকা ক্ষতিগ্রস্ত না করার উপায় বের করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করবে অন্তর্বর্তী সরকার। যাতে কর্মসংস্থান ধরে রাখা যায়। উৎপাদন খরচ সহনীয় পর্যায়ে থাকে, মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশন নিয়ে দেশ চালানোর চেষ্টা করছে। দেশের যে অবস্থা, সেখানে এই প্রেসক্রিপশন কাজে দেবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক নীতি নিয়েছে; তারল্য সরবরাহ কমিয়েছে- এ ধরনের নানা উদ্যোগ আছে। এগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য, শিল্পের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল নয়। আমরা আইএমএফের প্রেসক্রিপশন নিয়ে কিছু জায়গায় প্রস্তুতি নিতে পারি; কমপ্লায়েন্স পূরণ করার জন্য অনেক জায়গায় কাজ করতে পারি। কিন্তু আইএমএফের প্রেসক্রিপশন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সেটি আমাদের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
বিসিআই সভাপতি বলেন, এখন পর্যন্ত জ্বালানি সমস্যার সুরাহা হয়নি, বরং নতুন করে দাম বৃদ্ধি নিয়ে কথা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করে দেয় যে, সরকারের কার্যক্রম শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক নয়। এভাবে চললে নতুন শিল্প তো দূরের কথা, বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য টিকে থাকা কঠিন হবে। রাজনৈতিক দলগুলোও অর্থনীতি নিয়ে চিন্তিত নয়। তারা একে অপরকে নিয়ে নানা কথা বললেও অর্থনীতি নিয়ে কিছু বলছে না।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার-উল আলম বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভয় পাচ্ছে না, এমন কেউ আছে? এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানও কেউ দেখছে না। তবে আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় চলে যাওয়া উচিত। তাতে সবার মাঝে স্বস্তি আসবে।
গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া কখনো স্বস্তি আসবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি বুঝে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সংস্কার করে এবং বাকি সংস্কারের জন্য একটি পথনকশা করে দিতে পারে। আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকারের অর্থনীতি নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়লেও ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আর অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ভ্যাট যা বাড়ানো হয়েছে, তাতে জিনিসপত্রের দাম তেমন একটা বাড়েনি। সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের এমন বক্তব্যকে বিভ্রান্তিমূলক বলে মন্তব্য করেছেন বিসিআই সভাপতি।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, সরকারের ব্যয় সংকোচনের জায়গায় আমরা কিছু দেখছি না, রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের করজাল না বাড়িয়ে সহজ উপায়ে (ভ্যাট বৃদ্ধি) গেছে। আবার বলা হচ্ছে, ভ্যাট বৃদ্ধি দামের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এই বিষয়গুলো শিল্পোদ্যোক্তাদের দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলছে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমানে হতাশায় ভুগছেন। ব্যবসায়ীরা চান ইজ্জত-সম্মান নিয়ে চলতে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের ঢালাওভাবে খেলাপি বলা হয়; কেন খেলাপি হলো সেটি দেখা হয় না। বিগত সময়ে বিভিন্ন কারণে যে পরিমাণে ব্যবসায়িক খরচ বেড়েছে সেটি সবার পক্ষে সামলানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে অনেকে খেলাপি হয়েছেন। এজন্য কি ব্যবসায়ীরাই দায়ী?
আনোয়ার-উল আলম বলেন, খেলাপি নিয়ে সরকারের যেমন নীতি আছে, প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বও সরকারের রয়েছে। আর সুরক্ষা দিতে না পারলে উদ্যোক্তাকে ব্যবসা থেকে বিদায় নিতে হবে। কিন্তু এ সম্পর্কিত কোনো দেউলিয়া আইন দেশে নেই। এটি নিয়ে সম্প্রতি গভর্নরের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি নীতিগতভাবে এ বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি গ্রাজুয়েশনের সময় কমপক্ষে তিন বছর পেছানো প্রয়োজন। কারণ যেখানে তিন বেলা ভাত খাওয়ার সক্ষমতা নেই, সেখানে মোরগ-পোলাও খাওয়ার চিন্তা কীভাবে করি। এলডিসি উত্তরণের জন্য আমরা প্রস্তুত নই। আর প্রস্তুতি না থাকলে আমরা জেনেশুনে কেন আত্মহত্যা করব?