নতুন- হোক সেটা তত্ত্ব-তথ্য, চিন্তা কিংবা সৃজনশীল কোনো বিষয় হলে তাকে সন্দেহ করা অথবা তার মোহাবিষ্ট হওয়া মানবের যেন অপরিহার্য এক কর্তব্য। পুরোনো বরণেও একই মানসিকতা কাজ করে- দ্রুত বর্জন কর অথবা তার সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাক। আমাদের দেশেই নয়, আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত, শিক্ষিত ও ধনেমানে উঁচু দেশগুলোয়ও এ অবস্থা। নতুন চিন্তা, নতুন রীতি, নতুন ধর্মকে সন্দেহজনক মনে করাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ বেধেছে দুনিয়ার অনেক জায়গায়। নতুনকে অপমান-অসম্মান করাটা পৌরুষের লক্ষণ বলে গণ্য করা হতো একসময়। চলমান যুগেও ওই ভাবনার চর্চা কমবেশি বজায় আছে। বেশির ভাগ মানুষ স্বকালে বাস করে এবং ভাবে তারা আধুনিক। এরা ভুলে যায় যে স্বকালে বাস করলেই আধুনিক হওয়া যায় না।
পুরোনো অট্টালিকা নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে তার জায়গায় আধুনিক স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত আট তলা বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম বছর চৌদ্দ আগে। ড্রয়িংরুমের সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধতায় ডুবে গেলাম। ফ্ল্যাট মালিক পেশায় প্রকৌশলী, একদা লিবিয়ায় সরকারি কৃষিখামারে চাকরি করতেন। বেতন পেতেন প্রচুর। সেই টাকার একটি অংশ ৮৩ লাখ ২৫ হাজার টাকায় ছয় তলায় অবস্থিত ১ হাজার ৮৫০ বর্গফুট আয়তনের মনোহরি ফ্ল্যাট হাসিল করা হয়েছে। মালিকানায় গর্বিত প্রকৌশলী জানান, তিনি আধুনিক চিত্রকলার অনুরাগী; মেহেদী হাসানের গলায় মির্জা গালিবের গজল শুনতে শুনতে নিশিযাপন তাঁর অভ্যাস।
নিউজ পেপার প্রডাকশনের বিভিন্ন স্তর বিষয়ে তাঁর প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে মনে মনে বলি, আড়াইটা বাজে বাজে অবস্থায় ইনি জ্ঞানচর্চায় মেতেছেন। দুপুরের খানা খেতে আমায় যে ডেকে এনেছেন তা কি ভুলে গেলেন? বললাম, লাঞ্চ করেন কখন? প্রকৌশলীর উত্তর ফিকসড টাইমটেবল নেই। কখনো তিনটায় কখনো সাড়ে তিনটায় আবার কোনো কোনো দিন দেড়টায় সেরে ফেলি। আপনার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। মিজু, য়্যাই মিজু!
মিজু এলো। শ্যামবরণ তরতাজা সুঠামদেহী এক যুবক। তাকে বলা হয়, জলদি এই স্যারের জন্য খানা রেডি কর। গৃহকর্তার হুকুম তামিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মিজু। সে কিচেনে গেলে প্রকৌশলী জানান, তাঁর গ্রামের ছেলে মিজানুর রহমানকে তিনি আদর করে ‘মিজু’ ডাকেন। মিজুকে রান্না শিখিয়েছেন তাঁর স্ত্রী। চমৎকার রান্নার হাত মিজুর। ড্রয়িংরুমের এক কোনায় ডাইনিং টেবিল। দেখি, একজনের খাওয়ার আয়োজন। গৃহকর্তা আর অতিথি একই সঙ্গে ভোজন করবেন, এই রীতি উপেক্ষা করা হয়েছে। যে আচরণ করা হলো, সেটা অন্নকষ্টে ভোগা দুস্থজনকে খাইয়ে সওয়াব অর্জনের চেষ্টার মতো লাগছে। রাগে-ক্ষোভে অতিথির মাথায় রক্ত উঠতে থাকে। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার একমাত্র উপায়, আমন্ত্রককে ছয় তলা থেকে পাশের রাস্তায় সজোরে নিক্ষেপ করা। তা-ও করা যাচ্ছে না, ভদ্রতায় বাধছে।
মিজুর রান্না করা খাবার খেয়ে দারুণ তৃপ্তি পাই। যখন খাচ্ছিলাম, গৃহকর্তা গোসল করতে গেলেন। ইতোমধ্যে চমকপ্রদ একটা তথ্য পেয়ে গেলাম, যা এই লেখার একেবারে শেষ দিকে নিবেদন করব। পরচুলা খুলে ফরসা টেকোমাথাস্নাত প্রকৌশলীর সঙ্গে ফের সংলাপবিনিময় শুরু। তিনি এখন সাহিত্যবিষয়ক জ্ঞান অšে¦ষণে আগ্রহী। তাঁর জিজ্ঞাস্য ফিকশনের মাঠে কে চুটিয়ে ব্যাটিং করছে, কার লেখা বই পড়া উচিত? বললাম, হুমায়ূন আহমেদ।
হু-মা-য়ূ-ন! এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যেন পাঁচ হাজার টাকার জুতাশোভিত তাঁর পা হঠাৎ গোবর পাড়িয়ে ফেলেছে। বলেন, এ তো নতুন রাইটার। বোগাস! আই হেট নিউ রাইটার্স। নতুনরা কোনো কাজের না। অরিজিনালিটি একটুও নেই। ওরা পাবলিশারদের ব্রাইবড করে বই বের করে।
রাজধানীর একটি এলাকার নাম নয়াপল্টন। পল্টন নামক এলাকায় বাড়িঘর ও অধিবাস বেড়ে যাওয়ায় পৌরকর সংগ্রহের সুবিধার্থে ১৯৪৯ সালে নয়াপল্টন আর পুরানা পল্টন নামে দুই ভাগে চিহ্নিত করা হয় পল্টনকে। এরপর কেটে গেছে ৭৫টি বছর। এত বছরেও ‘নয়া’ বহাল পুরানা হলো না। টেকো প্রকৌশলীরও একই বিমার। ২০১১ সালে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ খ্যাতিগগনে চোখ ঝলসানো তারকা শুধু নন, পুরোনো তারকাও। তবু প্রকৌশলীর মতে, লেখা নতুন ও বর্জ্য।
চাবির ফুটোয় দেখা : দরজায় ফিট করা তালায় চাবি ঢোকানোর জন্য যে ফুটো (ইংরেজিতে কি হোল) তা ব্যবহৃত হয় ঘণ্টি বাজার পর। ফুটোতে চোখ লাগিয়ে বাইরে কে দাঁড়িয়ে তা দেখা যায়। এক বাড়িতে এরকম দরজায় ঘণ্টি বাজায় দর্শনার্থী। গৃহকর্ত্রী বলেন, দেখ তো কে এলো। কাঁচা বয়সি কাজের মেয়েটি ছুটে গিয়ে চাবির ফুটোয় চোখ লাগায়। তারপর গৃহকর্ত্রীকে জানায়, আপনার ভাই এসেছে আম্মা। তাঁর সঙ্গে আছে এক ভদ্রলোক আর একটা পুলিশ।
মেয়েটি বলতে পারত যে- সঙ্গে দুই ভদ্রলোক। কিন্তু বলেছে, এক ভদ্রলোক। পুলিশকে সে ভদ্রলোক মনে করে না। কাঁচা বয়সি মেয়ে তো অপক্ববুদ্ধি, পেকে ঝুনা হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরও অনেকের ধারণা পুলিশমাত্রই অভদ্র। আইন ভেঙে অত্যধিক মাল বহনকারী ট্রাক থামিয়ে চালকের কাছ থেকে পুলিশ ঘুষ নিচ্ছে, ঘুষের টাকা পকেটে পুরছে- এরকম আলোকচিত্র সংবাদপত্রের পাতায় ওঠে মাঝেমধ্যে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জদেহ রোগার্ত বৃদ্ধা ভিখারিকে হাত ধরে রাস্তা পার করে দিচ্ছে চৈত্রের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে কর্তব্যপালনরত পুলিশ- এরকম ছবি কি প্রকাশ পায়? পায়, খুব কম। পাঠক সমাজের কাছে ওটা নতুন কাহিনি। নতুন, অতএব উপেক্ষণীয়।
করোনা মহামারিকালে ঘরবন্দি নাগরিকদের সেবায় নিজের জীবন বিপন্ন করে পুলিশের নিবেদিত হওয়ার যেসব ঘটনা বিভিন্ন শহরে মানুষের অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে, সেগুলোর স্মৃতিচারণ করার গরজবোধ করি না আমরা। কারণ পুলিশ খুব ভালো কাজ করেছে, এটা নতুন বিষয়। নতুনের নেই কোনো বিশ্বাস। নিঃস্বার্থভাবে করা কাজ সন্দেহজনক। এ কাজ বাঁকা চোখে দেখা বাঙালির স্বভাবব্যাধি।
পাড়াতুতো কাকা মফিজুল হায়দার চৌধুরী অবশ্য ব্যতিক্রম। তিনি নতুনের অনুরাগী। মস্ত বড় ঠিকাদার ছিলেন। গণপূর্ত আর ওয়াপদার (তখনো পানি ও বিদ্যুৎ আলাদা হয়নি) নির্মাণকাজে আয়-উপার্জন প্রচুর। এই মফিজ কাকা শীত-বিকালে আমাদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন। তখন তাঁর বয়সি এক ব্যক্তি তাঁকে বলেন, একটু পরেই টাউন হলে (ওয়াপদার) এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুর মুর্শেদের বিদায় সংবর্ধনা শুরু হবে। ফাংশনে যাবেন না?
‘না যাব না ভাই’ বলেন, মফিজ চৌধুরী, ‘বিদায় মানে ওল্ডের বিদায়। ওল্ডের লগে আমার বিজনেস নো মোর। আই য়্যাম ওয়েটিং ফর নিউ এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার। ওনার রিসিপশনে অবশ্যই থাকব। কারণ নতুনেরে বাসি ভালো প্রাণমনে।’ আমরা বুঝলাম, বাণিজ্যের ভালোবাসাবাসিতে আমাদের এই কাকার হয় না কোনো তুলনা।
কাকা বেঁচে নেই। নইলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা যেত, লালমনিরহাটের চমক সৃষ্টিকারী নতুন পুলিশ অফিসার নূরনবী সম্পর্কে তাঁর কী অভিমত। লালমনিরহাট জেলার সদর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) নূরনবী ‘নিজেকে জনগণের গোলাম’ বলে মানেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, তাঁর থানায় মামলা করতে টাকা বা দালাল লাগবে না। মামলার জন্য নেতা দিয়ে তদবির করারও দরকার নেই। বলেছেন, আমাকে কেউ স্যার বলতে হবে না। ওসি নূরনবী বিভিন্ন হাটবাজারে গিয়ে পুলিশের সেবা গ্রহণের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভাষণ ভাইরাল হয়। তাই তিনি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন।
মানুষ দোয়া করছে, ইয়া মাবুদ! নূরনবীর মতো হাজার হাজার সরকারি অফিসারে তুমি দেশ ভরিয়ে দাও। এরই মধ্যে মুদিপণ্য কিনতে গেলাম বাজারে। দেখি, দোকানিরা নূরনবী চর্চা করছেন। যুবক বয়সি এক দোকানি তার পাশের বুড়ো বয়সি দোকানিকে বলছে, ‘কাকা এরকুম সাদামানুষ দ্যাশে নিশ্চয়ই আরও আছেন। তানরা প্রচার পাইতেছেন না। তানগোরে ধইরা ধইরা টিভি পর্দায় আনা উচিত।’
‘রাখ্ তোর সাদামানুষ।’ খেকিয়ে ওঠেন বুড়ো দোকানি, ‘কী মতলবে উনি সোন্দর সোন্দর কথা কইলেন, সেইটা তদন্তকরণ দরকার। নতুন বুলি ঝাড়ে বইলা তানরে ফেরেশতা মনে করবি তো ঠকবি।’ যুবক দোকানি বলে, ‘নতুনে কামকাজ সন্দেহকরণ ছাড়া আপনের তো ঘুম হয় না। আপনেরে খোশ করতে অইলে তো সব শিশুর পুরান হওয়ার জন্য ৭০ বছর বয়সে জন্ম নিতে হবে।’
খোদা সমীপে পত্র : ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে বাংলাদেশে এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি) নামে নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটেছে। একেবারে টগবগে তরুণদের উদ্যোগে গড়া এই দল সবার দৃষ্টি কেড়েছে। নাগরিকরা বলছেন, এ দল পারবে। সন্দেহও আছে নাগরিকদের। সন্দেহ যাদের আছে তাদের মতে, এ দল পারবে না। আমার পড়শি ভুঁইয়া আজিমউদ্দিন বলেন, একটা দল সবে মাঠে নেমেছে। তার পারফর্ম তো পুরোদমে শুরুই হলো না। এরই মধ্যে আমরা পাণ্ডিত্য ফলাচ্ছি- আর বলছি, পারবে না/পারবে না। নতুনকে দুঃখ দিয়ে কী লাভ? নতুনের মনে আনন্দ তৈরির দিকে আমাদের মনোযোগ নেই কেন? কেন খালি সন্দেহ আর সন্দেহ?
বললাম, প্রশ্নটা খোদাকে করলে ভালো হয়। খোদার কাছে একটা চিঠি লিখুন। পড়শি বলেন, পাগলামোভরা প্রস্তাব। তবে মজাদার। খোদাকে চিঠি পাঠানো কীভাবে সম্ভব? প্রশ্নের জবাবে তাঁকে বহু আগে বরীন্দ্রসংগীতশিল্পী মাহবুবুর রব সাদী বর্ণিত গল্পটি শোনাই।
অর্থাভাবে জর্জরিত এক ব্যক্তি খোদাকে চিঠিতে লিখেছে- ‘ঈদের সাত দিন বাকি। ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনতে পারছি না। ইয়া রাব্বুল আলামিন, আপনি রক্ষা করুন। ঈদ উদ্যাপনের জন্য কিছু টাকা পাঠান।’ খামে ভরা এবং ‘টু অলমাইটি আল্লাহ’ লেখা সেই চিঠি- পোস্ট অফিসের লোকরা আফসোস করে এবং দয়াপরবশ হয়ে সাজানো মানি অর্ডারে ওই ব্যক্তিকে চার হাজার টাকা পৌঁছায়। কোরবানির ঈদের আগে আবার চিঠি লিখল সেই লোক- ‘প্রভু, তোমার পাঠানো টাকায় রোজার ঈদটা ভালোই করা হয়েছে। এবারও আমার সংকট চলছে। দয়াময়! তাড়াতাড়ি কিছু টাকা পাঠাও। তবে একটা অনুরোধ খোদা, টাকাটা ফেরেশতার হাতে পাঠিও। কারণ আমার ধারণা, তুমি আট হাজার টাকা দিয়েছিলে, হারামজাদা পোস্ট মাস্টার সেই টাকার অর্ধেকটা মেরে দিয়েছে।’
পাচকের পরিচয় : লিবিয়া প্রত্যাগত প্রকৌশলীর বাড়ির মিজানুর রহমান মিজুর হাতে তৈরি খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত আমি তাকে টিপস দিতে উদ্যত হওয়ামাত্র সে ফিসফিস করে বলে, ‘স্যার আমি বাবুর্চি না। আইএ পাস করে ঢাকায় এসেছি। সাহেব আমার চাচাতো ভাই। ভাই-ভাবি মিলে নতুন সিস্টেম চালু করেছে। তাঁরা আমাকে চাকর সাজিয়ে কাজ করাচ্ছে। খেতে দিচ্ছে, থাকতে দিচ্ছে। বিনিময় ব্যবস্থা আর-কী। আমার বাবাকে অন্ধকারে রেখে এখানে গোলামি করছি। আমার আনন্দের নাই কোনো সীমানা।’
মিজু হাসতে থাকে। হয়তো একেই বলা হয়, কান্না আড়াল করা হাসি।
লেখক : সাংবাদিক