সপ্তাহজুড়ে বেশ কিছু প্রশ্ন নিয়ে সরগরম ছিল দেশের মূলধারা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পট পরিবর্তনের প্রথম দিকে এই অন্তর্বর্তী সরকার কত দিন ক্ষমতায় থাকবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদৌ হবে কি না, কিংবা হলেও তা কবে নাগাদ হবে, এমন প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছিল। প্রায় ছয় মাস আগেই সেনাপ্রধান কর্তৃক ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাবনা ঘোষণা এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহল থেকে স্বল্প সংস্কার চাইলে এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন এবং বেশি সংস্কার চাইলে জুন ২০২৬-এর মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা হয়। মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করেই এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে জুলাই থেকে মার্চ, এই ৯ মাসে দেশের নানাবিধ পরিবর্তন এবং উ™ূ¢ত পরিস্থিতিতে এখন নির্বাচন আদৌ হবে কি না, এমন প্রশ্নটি সম্ভবত তেমন জোরালো নয়। বরং জোরালো হলো এমন প্রশ্ন- প্রথমে কোন নির্বাচন হবে? এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্যে কোনটি আগে হবে বা হওয়া উচিত এমন প্রশ্নে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন নতুনভাবে গঠিত হয়েছে। তাদের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক বেশি। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে এই কমিশন জাতির প্রত্যাশা পূরণ করবে- এমনটা সবার আকাক্সক্ষা। এই আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে বর্তমান কমিশনকেও কলঙ্ক নিয়ে বিদায় নিতে হবে।
তা ছাড়া দেশে পুলিশ প্রশাসন মুখ থুবড়ে পড়েছে। শত শত অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্য হয় পালিয়েছেন না হয় চাকরিচ্যুত, আটক এবং ওএসডি (ক্লোজ) অবস্থায় গণহত্যাসহ নানাবিধ অপরাধের দায়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। মব বা জনরোষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ সপ্তাহে ছাত্র-জনতার নামে খোদ গুলশানের অভিজাত ও স্পর্শকাতর এলাকায় দুর্বৃত্তরা ঢুকে পড়ে এক বাড়িতে। তারা আসবাবসহ সবকিছু তল্লাশি করে। গুলশানে এমন নৈরাজ্য চললেও দীর্ঘ সময়ে পুলিশ বা মাঠে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ মোতায়েন সেনাবাহিনী তা জানতে পারেনি। আর জানলেও সময়মতো সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। দেরিতে পৌঁছলেও তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করার মতো দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি। বরং জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পরদিন তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এমন ঘটনা কেবল রাজধানী গুলশানেই নয়, দেশের বহু অঞ্চলে ঘটেছে, ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে বলে আশঙ্কা করা যায়। দেশের কোথাও কোথাও মব জাস্টিসের অভিশাপে অপ্রকৃতস্থ, ভবঘুরেসহ নিরীহ মানুষের প্রাণ ঝরেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে রকম দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে, তাতে প্রতীয়মান হয়, একই দিনে সারা দেশে একযোগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে এখনো প্রস্তুত নয় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
অতীতে বিতর্কিত, কলঙ্কিত ও অগ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করা শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাসহ অনেকেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও বিচারের সম্মুখীন। অনেকেই পলাতক ও জেলে অন্তরীণ। এমতাবস্থায় মাঠপর্যায়ের প্রশাসন একই দিনে লাখো নির্বাচন কেন্দ্রে কার্যকর জনবল নিয়োগ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য কতটা আত্মবিশ্বাসী, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যদিও সব জেলার পরিস্থিতি এক রকম নয়, তবু মাঠের পরিস্থিতি স্পষ্টই প্রমাণ করে যে প্রশাসনের পক্ষে প্রথমে একই দিনে সারা দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, পুলিশ প্রশাসন তাদের নিজস্ব নিয়মেই চলে। নির্বাচনের সময় পুলিশ জেলা প্রশাসন বা নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের অধীনে থাকলেও বাস্তবতা হলো পুলিশ তার ওপর অর্পিত যেকোনো দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন অথবা বর্জনের জন্য এক শ একটি কারণ বা অজুহাত দাঁড় করাতে পারে। দেশে একই দিনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা বিধানের সক্ষমতা বর্তমান পুলিশের নেই বলে ধরা চলে। দেশের বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। এমতাবস্থায় কোনো কেন্দ্র বা জেলায় নির্বাচনকালে অব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি কর্মকর্তা বা নির্বাচন কমিশন পুলিশকে দোষারোপ করবে, এটাই স্বাভাবিক। পুলিশও তার সীমাবদ্ধতা বা অন্য কোনো কারণ দাঁড় করাবে। ছোট্ট উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে নিয়োজিত অধিকাংশ পুলিশ সদস্যই এসেছেন মফস্বল থেকে। তারা এখনো শহরের অলিগলি, অপরাধপ্রবণ এলাকা এবং এমন অভিজাত শহরের মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে তাদের অসহায়ত্ব বা শহরের জটিলতা অনুধাবনে দুর্বলতা প্রকাশ্যে আলোচিত হচ্ছে আজকাল। সুতরাং প্রথমবারই একই দিনে সারা দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই পুলিশ বাহিনী এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসকদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন আগের প্রশাসকরা নির্বাচন অব্যবস্থাপনার দায়ে অনুকরণীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও শাস্তির সম্মুখীন।
প্রথমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগ্রহ বা আপত্তির নেপথ্যে রাজনৈতিক সমীকরণও বেশ জটিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ও দলীয় প্রতীকের বাইরে আয়োজনের কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলো, এই নির্বাচন একটি নির্বাচনি এলাকায় দলীয় অবস্থানের জানান দেয়। ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রায় নির্বিঘ্নে তার প্রার্থিতা ঘোষণা করতে পারবে বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু অন্য যেকোনো দল, এমনকি নবগঠিত ছাত্রদের দলটিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন করতে মাঠে নামলেই দলীয় বিভক্তি, বিদ্রোহী প্রার্থী সৃষ্টি, বহিষ্কার, পাল্টা বহিষ্কার, অবাঞ্ছিত ঘোষণা, রাস্তাঘাট অবরোধ, হরতাল, অরাজকতা এমনকি সহিংসতা জড়িয়ে পড়বে। দলীয় হাইকমান্ড বা পুলিশ এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলোও এমন বিভক্তি হোক, তা মনেপ্রাণে চায় না। তাই জামায়াতে ইসলামী ছাড়া সব দলের সম্ভাব্য লক্ষ্য সবাইকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দলীয় ঐক্য ও চেতনা ধরে রাখা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই সুফল ঘরে তোলা।
আবার অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রথমে কেউ একটি এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনিই নির্ধারণ করেন কে হবেন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি। দল তার কথা ফেলতে পারে না। তার ও দলের আস্ফালনে স্থানীয় ভদ্রসমাজের কেউ তখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না। তদুপরি একজন সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজনই যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থীরূপে মাঠে নামেন, তখন পরিস্থিতি হয় একপেশে। পুলিশ ও মাঠ প্রশাসন তখন মুখে মুখে যতই নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা বলুক না কেন, বাস্তবে ও মননে যে দল ক্ষমতায় এবং যে দলের সংসদ সদস্য এলাকার দায়িত্বে থাকেন, তার তালুবন্দি হয়ে পড়েন। আর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তার নানাবিধ সরকারি বরাদ্দ প্রদানের সুযোগ থাকে, যা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রভাব ফেলে এবং লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে তখন আর কিছুই থাকে না। আর স্থানীয় পর্যায়ে অবৈধ ও অলিখিত আয়ের উৎস থাকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারি দলের হাতে। ফলে কালোটাকার প্রভাব পড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এই যুক্তিতে অনেকেই সোচ্চার দলীয় প্রভাব বিশেষত সংসদ সদস্যের খবরদারি শুরুর আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে।
অতীতে জামায়াতের একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও টেকনোক্র্যাট কোটায় আরেকজন দুটি মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে এই দুইজন জামায়াত নেতা সততার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন, যা জামায়াতবিরোধীরাও স্বীকার করেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জামায়াতের সদস্যরা নির্বাচিত হলে তারাও সততা ও জনসেবার নজির স্থাপন করে নিজ দলের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করবেন, এমন আশাবাদ করতেই পারে জামায়াতে ইসলামী।
অন্যদিকে পতিত সরকারের বহু সুবিধাভোগী, অন্ধ সমর্থক ও তাদের অবৈধ টাকার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা অবশ্যই চাইবে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হোক এবং তাদের সমর্থকরা অন্তত এই উপলক্ষে চাঙা হোক।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়েই নিজেদের অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তার স্বাক্ষর রাখতে সচেষ্ট হবে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ। বিশেষত তাদের দুর্গ বলে পরিচিত কিছু এলাকা ও সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় তারা এই সুযোগ নিয়ে ভবিষ্যতে এই সাফল্য সম্প্রসারণ করতে সচেষ্ট হবে। একই সময়ে সংখ্যালঘুদের প্রার্থী সাজিয়ে এবং তাদের ওপর নিজেদের লোকজন দিয়েই আক্রমণ ও সহিংসতা সাজিয়ে বিশ্ব দরবারে ও পাশের দেশে সংখ্যালঘুদের অসহায়ত্ব তুলে ধরতে পারে এই দল। সুতরাং আওয়ামী লীগকে এই সুযোগ যারা দিতে চায় না, তারাও আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘুদের নীরব ভোট বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং আওয়ামী লীগের মাঠে অনুপস্থিতির সুযোগে নিজেদের দিকে টানতে চায় কোনো কোনো দল। অন্য সব রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের এই উপস্থিতি প্রমাণের সুযোগ দিতে চায় না।
এমন রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই তৃতীয় স্রোত তৈরি করেছে গণপরিষদ নির্বাচন ও সেকেন্ড রিপাবলিক প্রসঙ্গ, যা নিয়ে পরবর্তী সময়ে লেখার প্রত্যাশা রইল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজনীতি ও প্রশাসনের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ। এই সময়ে যেকোনো ভুল সিদ্ধান্তের কঠোর খেসারত গুনতে হবে সমগ্র জাতিকে। তাই ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবার জন্য মঙ্গলজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে প্রয়োজন সব অংশীজনের অংশগ্রহণে ফলপ্রসূ আলোচনা ও প্রথমে কোন নির্বাচন প্রয়োজন, এ বিষয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। সেটাই হবে মহান জুলাই বিপ্লবের সার্থকতা।
লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল : [email protected]