সুন্দরবন শুধু দেশের জাতীয় সম্পদই নয়, এটি দেশের জাতীয় বনের মর্যাদাও পেয়েছে। সেই সুবাদে অরণ্যটির গুরুত্বও ব্যাপক। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও দুর্লভ। বনে প্রায় ৪২৫ প্রজাতির প্রাণী, ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। প্রাণীদের মধ্যে ৩০০ প্রজাতির পাখি, ৩২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। বিপন্ন প্রজাতির ইরাবতী ডলফিনেরও বাস সুন্দরবনের জলজ সীমানায়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সুন্দরবনের আকর্ষণ যেমনি রয়েছে, তেমনি প্রাপ্তির পরিমাণও ব্যাপক।
সুন্দরবনের ৩০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রাণী হচ্ছে চিত্রল হরিণ। বনের আকর্ষণীয় প্রাণীদের মধ্যে বাঘ এবং চিত্রল হরিণ অন্যতম। বাঘের সংখ্যা অপ্রতুল হলেও হরিণের সংখ্যা প্রচুর; দেড় লাখের ওপরে। তবে গবেষকদের ধারণা বর্তমানে এ সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রচুর; তাদের অভিমত সুন্দরবনে এখন লাখের নিচে রয়েছে হরিণের সংখ্যা। তবে সংখ্যা যাই-ই হোক না কেন, সুন্দরবনের যত্রতত্র হরিণের সাক্ষাৎ ঘটে এটাই সত্যি। বাঘের দেখা না পেলেও হরিণ দর্শনের মাধ্যমে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারেন পর্যটকরা। মূলত সুন্দরবনে পর্যটকদের আগমন ঘটে এই দুই প্রজাতির প্রাণীর সাক্ষাতের উদ্দেশে। অথচ এই দুই প্রজাতির প্রাণীই বেশি নির্যাতিত হচ্ছে সুন্দরবনে। বাঘের সংখ্যা অপ্রতুল বিধায় দু-একটা বাঘ শিকার হলেই হইচই পড়ে যায়। অন্যদিকে হরিণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত। ডজন ডজন হরিণ শিকার করা হলেও তা নিয়ে খুব বেশি হইচই হতে দেখা যায় না। হাতে গোনা কয়েকটা পত্রপত্রিকা ব্যতীত অন্যান্য প্রচারমাধ্যমে হরিণ নিধনের বিষয়ে খুব একটা সংবাদ পরিবেশন করা হয় না। অবশ্য এর মূল কারণ হচ্ছে, বিশাল সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হরিণ নিধনের সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে এই নিয়ে প্রত্যহ সংবাদ সংগ্রহ করা অসম্ভব প্রায়। তেমনি নিঝুম দ্বীপের হরিণের ক্ষেত্রেও তদ্রƒপ। নিঝুম দ্বীপে ১৯৯৬ সালে চার জোড়া হরিণ অবমুক্ত করা হয়েছিল প্রথমে। পর্যায়ক্রমে সেই হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২২ হাজারে উন্নীত হয়েছিল। সেই সংখ্যাটাও বর্তমানে স্থিত নয় : হ্রাস পেয়েছে প্রচুর। খাদ্যসংকট, বুনো কুকুর আর খ্যাঁকশিয়ালের অত্যাচারেই মূলত ওরা অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। হরিণগুলো লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। লোকালয়ে আশ্রয় নিতে এসেও ওরা মানুষের কাছে নিরাপত্তা পায়নি, বরং নানানভাবেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অবশ্য নির্যাতনের সংবাদটা এলাকায় দ্রুত রটেও যাচ্ছে। ফলে সোর্সের ভিত্তিতে বনকর্মীরা দুষ্কৃতকারীদের আটক করতেও সক্ষম হচ্ছেন। তাতে বলা যায়, সুন্দরবনের চেয়ে নিঝুম দ্বীপে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য এক যুগ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে; বলা যায়, প্রাকৃতিক কারণেই হরিণের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সুন্দরবনের চোরা শিকারিদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে হরিণ। বিভিন্নভাবে ওরা হরিণ শিকার করে। সুন্দরবনের যেসব এলাকায় হরিণের বিচরণ বেশি, সেসব স্থানে নাইলনের জাল পেতে, বিষ মাখিয়ে, স্প্রিং বসানো ফাঁদ পেতে, কলার মধ্যে বড়শি ঝুলিয়ে, চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে, তির অথবা গুলি ছুড়ে শিকার করে। এসব বেশি করা হচ্ছে হিরণ পয়েন্ট, দুবলারচর, কটকা, তালপট্টি, কচিখালি, দুবলা চান্দেরশ্বর, বগি, চরখালী এলাকায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় এতদাঞ্চলে। বিশেষ করে রাসমেলার মৌসুমে শিকারিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওই সময় বন বিভাগের লোকজনের হাতে শিকারের সরঞ্জামাদিসহ প্রচুর গুপ্ত শিকারি আটকের ঘটনাও আমরা জানতে পেরেছি। তবে তাদের শাস্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আর জানা যায়নি।
রাসমেলাকে টার্গেট করার প্রধান কারণ হচ্ছে, এ সময় পর্যটকের আনোগোনা বেড়ে যায় বন প্রান্তরে। ফলে চড়া দামে হরিণের মাংস বিক্রি করার সুযোগ পায় ওরা। এ ছাড়াও হরিণের চামড়া-শিং বিলাসী মানুষ সংগ্রহ করেন ড্রইংরুম সাজিয়ে রাখতে। বনাঞ্চল এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিরা হরিণের মাংস খাইয়ে উৎসবাদীও পালন করেন। কোনো বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস সরবরাহ করেন; এমন তথ্যও আমরা জানতে পেরেছি। শুধু আমরাই নই, হরিণ নিধন সম্পর্কে লন্ডনের একটি সংস্থা, ‘ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ ও জু-লজিক্যাল সোসাইটি’ চোরা শিকারি ও শর্ষের ভূত সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে। সে তথ্য সঠিক হলে সুন্দরবনের হরিণ প্রজাতি শিগগিরই অস্তিত্বসংকটে পড়বে। উদ্বেগজনক এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হচ্ছে, বন বিভাগকে শিকারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। বন্যপ্রাণী নিধন আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে যথাযথভাবে। জেলজরিমানার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে; মুক্তি পেয়ে যেন বেপরোয়া না হয়ে ওঠে তারা। বিষয়টি নিয়ে খুব দ্রুত ভাবতে না পারলে চিত্রল হরিণের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। কাজেই ‘ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ ও জু-লজিক্যাল সোসাইটি’র তথ্যটিকে গুরুত্ব দিয়ে বনকর্মীদের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে। তাহলে হরিণ প্রজাতি সুন্দরবনে নির্বিঘ্নে কাটাতে পারবে। পাশাপাশি আরেকটা কাজও করা যেতে পারে, শৌখিনভাবে যারা হরিণ পালন করতে ইচ্ছুক, তাদের সহজ শর্তে খামার করার অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। তাতে হরিণ সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল খানিকটা কমে যাবে। খামারের শর্ত মেনে বিকিকিনি হলে সুন্দরবনের হরিণগুলো নিরাপদ, নির্বিঘ্নে কাটাতে পারবে বলে বিশ্বাস আছে।
♦ লেখক : কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক লেখক