মাগরিবের আজান হতেই রায়ান এক গ্লাস শরবত কোনো রকম গলায় ঢেলেই দৌড়ে বের হয়ে গেল বাড়ি থেকে। তার যেতে হবে তানিমদের বাড়ি। তারপর আরও কয়েকজন মিলে চলে যাবে নদীর পাড়ে। আজ পর্যন্ত সে কখনো নদীর পাড়ে গিয়ে ঈদের চাঁদ দেখার অনুমতি পায়নি তার দাদার থেকে। এখন সে যথেষ্ট বড় হয়েছে, তাই এবার তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। রায়ানদের বাড়ির আশপাশে প্রচুর গাছপালা থাকায় বাড়ি থেকে ঈদের চাঁদের দেখা পাওয়া যায় না। যেতে হয় নদীর পাড়ে। প্রতি বছর যখন বন্ধুরা এসে গল্প করত কে আগে চাঁদ দেখেছে, দেখতে কেমন ছিল, এসব শুনে রায়ানের খুব খারাপ লাগত। যাক অবশেষে আজ অনুমতি পেল। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে রোজাটা ভেঙেই বের হয়ে গেল। রায়ান এ রমজানে দুটি রোজা রেখেছে। প্রথম এবং শেষটা। ওর দাদা বলেছে ছোটদের প্রথম ও শেষ রোজা রাখলেই বাকি সব রোজা হয়ে যায়। কিন্তু রায়ান ঠিকই জানত দাদা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তাও সে সামনের রমজানে দশটি রোজা রাখবে এ শর্তে এবার দুটি রোজাই রাখতে রাজি হয়েছে। রায়ান, তানিম, ফারহান আরও দশ-বারোজন মিলে ততক্ষণে নদীর পাড়ে পৌঁছে গেল। পশ্চিম আকাশে দিগন্ত ছুঁয়ে ঝুলে আছে কাস্তের মতো এক সোনালি চাঁদ। খানিক দূরেই একটি তারা ঝলমল করছে। এখন সবাই কোলাকুলি করে একজন আরেকজনকে ঈদ মুবারক জানাচ্ছে। এরপর ফারহান চাঁদ দেখার দোয়া পড়ল। সবাই তাতে শামিল হয়ে আমিন বলল। অন্যরা কেউ এখনো দোয়া শিখেনি, ফারহান বয়সে তাদের থেকে অনেকটা বড় হওয়ায় সেই দোয়া করল। সবাই হইহল্লা করে বাড়ি ফিরছে। অনেকের ঘর থেকে ভেসে আসছে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।’ সবাই সঙ্গে সঙ্গে গাইতে লাগল।
কয়েকজন যার যার বাড়ি চলে গেল আর বাকিরা চলে এলো রায়ানদের বাড়িতে। রায়ানের মা তখন সবাইকে বুট-মুড়ি মেখে দিল। সবাই খাওয়া শেষ করে বারান্দায় এসে বসল। তখন রায়ানের দাদা এসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কেমন দেখলে ঈদের চাঁদ?
একেকজন একেকভাবে বলা শুরু করল, একসঙ্গে বলায় কারও কথাই স্পষ্ট করে বোঝা গেল না।
রায়ান একটা চেয়ার এনে দাদাকে দিল, দাদা চেয়ারে বসে সব বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করছে। তিনি ছোটবেলায় কীভাবে ঈদ দেখা উদ্যাপন করতেন। পুরোনো সব গল্প বলতে লাগলেন।
একসময় তানিম জিজ্ঞেস করে, দাদা, আমরা যে ঈদ করি, এটা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
দাদা বলতে লাগলেন- সে তো অনেক আগের কথা, আমাদের নবীজি (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে আসেন, তখন তিনি দেখলেন, মদিনাবাসী দুই দিন আনন্দ-উৎসব পালন করে। তিনি জানতে চাইলেন, এই উৎসবের কারণ কী? সাহাবারা জানালেন, জাহেলিয়াত যুগ থেকে এ দুই দিন তারা খেলাধুলা আর আনন্দ করে কাটান। তখন রাসুল (সা.) বললেন- আল্লাহ তোমাদের সেই দুই দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম দুই দিন দান করেছেন, একটি ঈদুল ফিতর, আরেকটি ঈদুল আজহা।
এরপর থেকেই রমজানের এক মাস সিয়ামসাধনার পর শাওয়ালের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন শুরু হয়।
তোমরা সবাই তো জানো, আরবি মাস শুরু হয় চাঁদের ওপর নির্ভর করে। তাই চাঁদ দেখা গেলে বোঝা যায় যে শাওয়াল মাস শুরু হয়েছে।
এ ঈদ হচ্ছে আমাদের খুশির দিন। এ দিনে আমরা সবার বাড়িতে যাই, দেখা করি। নতুন কাপড় পরি। সবার সঙ্গে খুশি মেজাজে গল্প করি। এককথায়, এ দিন আনন্দের দিন।
সবাই খুব খুশি হলো দাদার থেকে ঈদ নিয়ে এত কিছু জানতে পেরে। একসময় গল্প করা শেষ হলো, এক এক করে সবাই বাড়ি চলে গেল। এখন শুধু তানিম রয়েছে।
রায়ান তানিমকে বলছে- তানিম, জানিস, আমার এবার তিনটে ঈদের জামা হয়েছে। দাদা একটা দিয়েছে, বাবা একটা দিয়েছে, আর নানুবাড়ি থেকে একটা দিয়েছে। তবে আমার নানুবাড়ির থেকে যে জামাটা দিয়েছে, ওটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।
তানিম- কেন? বাকিগুলো কি সুন্দর না?
রায়ান- হ্যাঁ, সুন্দর তো। তবে বাবা কিনে দিল শার্ট আর প্যান্ট। আর নানুবাড়িরটা একটা সাদা পাঞ্জাবি, দাদারটাও সাদা পাঞ্জাবি, তবে এটা থেকে ওইটাই আমার বেশি ভালো লেগেছে।
তানিম- ওহ, বুঝেছি। তোর সাদা রং বেশি পছন্দ। আমারও সাদা পাঞ্জাবি অনেক ভালো লাগে।
রায়ান- “হুম। তোকে আজ নতুন কাপড় দেখাব না। দেখালে আমার ঈদ হবে না।”
তানিম হেসে দিলো- “আচ্ছা, কাল দেখাস তাহলে।”
রায়ান- তুই কি কিনলি, বললি না তো?
তানিম সহজ গলায় বলল- আমার বাবার একটু ঝামেলা তো, তাই এই ঈদে আমাদের কেনাকাটা হয়নি। মা বলছে, আগের একটা পাঞ্জাবি ধুয়ে আয়রন করে দেবে, তাহলে একদম নতুনের মতো হয়ে যাবে। ওটা পরেই আমি নামাজ পড়তে যাব কাল।
রায়ান এবার বুঝতে পারল, তার ভুল হয়ে গেছে। আগেই জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল কথাটা। তা না করেই সে তার এতগুলোর জামার গল্প করেছে। তানিমের নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছে।
তানিম সকালে আসবে বলে চলে গেল।
রায়ানের মনটা কেমন খারাপ লাগছে। ঘরে সবাই এত আনন্দ করছে, কিন্তু তার কেন জানি কোনো আনন্দ কাজ করছে না। চুপচাপ বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ পেছন থেকে দাদা বলল- রায়ান, কী হয়েছে তোমার? সবাই ঘরে, তুমি বাইরে কেন?
রায়ান- ‘জানেন দাদা, তানিমকে ওর বাবা এবার নতুন কাপড় কিনে দেয়নি।
দাদা- নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে, তাই দেয়নি। এজন্যই কি তোমার মন খারাপ?
রায়ান কোনো উত্তর দিল না। তখন দাদা মাথায় হাত রেখে বলল- তোমার এখন মন যা চাইছে, তাই করো। আমি জানি, তুমি ঠিক কাজটিই করবে।
রায়ান তখন কেঁদে দিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল- আমার তিনটে জামা, এতগুলো দিয়ে আমি কি করব?
দাদা- বলছি তো, তোমার মন যা চাইছে, তাই করো।
খুব সকালে রায়ান ঘুম থেকে উঠে, আলমারি খুলে ওর নানুবাড়ি থেকে দেওয়া সাদা পাঞ্জাবি বের করে একটা ব্যাগে ভরল। তারপর তানিমদের বাড়িতে চলে গেল। তানিম তখন দাঁত ব্রাশ করছিল। রায়ান কাছে গিয়ে বলল- তানিম, জানিস, তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বলেই তানিমের হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, তারাতাড়ি তৈরি হয়ে যা। আমরা একসঙ্গে নামাজে যাব।
রায়ান আর দাঁড়াল না, চলে এলো। রায়ান ভাবছে, তানিম নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে পাঞ্জাবি দেখে। এটাই তো ঈদের আসল মজা, সবাই আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। নাহলে কি আর ঈদে মজা পাওয়া যায়?