রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি খুব একটা চলছে না। ফলে দ্রুতই বারিধারা পৌঁছে গেলাম। আমি বারিধারা নতুন বাজার পর্যন্ত এসে রীতিমতো থমকে গেছি। সিএনজি আর যাবে না। রাস্তা বন্ধ, তবে মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করছে। সিএনজিতে বসেই দেখলাম প্রগতি সরণি পুরোটাই ছাত্রদের দখলে। ছয়-সাত দিন ধরে টেলিভিশনে খবরে দেখছিলাম এবং পত্রিকায় পড়ছিলাম। আজ নিজ চোখে এই আন্দোলন দেখার সৌভাগ্য হবে-সেটি ভাবিনি। একবার ভাবনায় এলো, আজ আর পাসপোর্ট কালেক্ট করব না। আগামীকাল নেব। পরামর্শ চেয়ে ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তাকে কল করলাম। তিনি বললেন, ‘আপনার হাতে সময় আছে আর একদিন। কালও পরিস্থিতি হয়তো এমনই থাকবে। কাজেই কষ্ট করে হলেও হেঁটে গিয়ে আজকেই ডেলিভারি নিয়ে নিন।’
ছেলেকে দুপুরের খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে বাইরের কাপড় পরে চট করে বেরিয়ে পড়েছিলাম। তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর থেকে শ্যামলী যাব ইন্ডিয়ান ভিসা সেন্টারে। গাড়ি বের করা যাবে না। দেশে একটা অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। রিকশায়ও পুরোটা পথ যাওয়া যাবে না। শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে নেমে ফুটওভার ব্রিজ পার হলাম। রাস্তার অন্য পারে কল্যাণপুরের দিকে ১০০ গজের মতো হেঁটে ইন্ডিয়ান ভিসা সেন্টারে পৌঁছলাম। এখানে আরও অনেকে এসেছেন পাসপোর্ট ডেলিভারি নেওয়ার জন্য। সবার চোখে-মুখে ভীষণ বিরক্তি। আজ সকালেই ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের ভিসা সেন্টারটি যমুনা ফিউচার পার্কে শিফট করেছে। মনে হলো কেউ আমাকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দিল। দেশে কিশোর আন্দোলন চলছে, আর সঙ্গে বাহন নেই। অন্য যারা পাসপোর্ট নিতে এসেছেন, তাঁদের অনেকেই সিএনজি নিয়ে বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থিত যমুনা ফিউচার পার্কে যাচ্ছেন। আমার সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই। নেই অন্য ভাবনা ভাবার অবকাশ।
আমি একটি সিএনজি নিলাম। আজ আগস্টের ৪ তারিখ। ৬ তারিখ সকালে আমার ফ্লাইট। ৮ তারিখ আমি পিএইচডি ডিগ্রি পাওয়ার অভিপ্রায়ে ডিফেন্ড করব। সহজ বাংলায় বলতে হয়-আমাকে ভাইবা দিতে হবে। ফলে যেভাবে হোক আমাকে আজই পাসপোর্ট কালেক্ট করতে হবে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলছে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ঘটনার সূত্রপাত সপ্তাহখানেক আগের। এক কলেজের শিক্ষার্থীরা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। প্রথম বাসটি ড্রাইভার সেখানে বাঁকা করে থামিয়েছিল, যেন অন্য কোনো বাস না থামতে পারে। অন্যদিকে আরেক পরিবহনের দুুটি বাস রেষারেষি করে ফ্লাইওভার থেকে নামতে থাকে। এর মধ্যে তিন নম্বর বাসকে পেছনে রেখে দুই নম্বর বাসটি এক নম্বর বাসের বামে চলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যায়। বারো জন গুরুতর আহত হয়।
ঘটনার পর পরই হতাহতদের সহপাঠীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কলেজ এবং ওই এলাকার অন্যান্য সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঘাতক বাসসহ অন্যান্য বাস ভাঙচুর করে। শিক্ষার্থীরা দোষী বাসচালকের বিচারের দাবিতে ওই এলাকায় বিক্ষোভ করে এবং সড়ক অবরোধ করে রাখে।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকরা একজন মন্ত্রী, যিনি একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের নেতাও, তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি হাসিমুখে বলেন, পাশের দেশে গতকালই গাড়ি দুর্ঘটনায় ৩৩ জন মারা গেছে। সেখানে কি কেউ এভাবে তেড়ে এসে কথা বলেছে?
মন্ত্রী একটা মিটিংয়ে ছিলেন। কথাগুলো তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, যেন তেমন কিছুই ঘটেনি। মিডিয়া এ দৃশ্য প্রচারের পর কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দেশের মানুষ কল্পনাও করতে পারে না যে, এমন অনভিপ্রেত এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দায়িত্বশীল কোনো মানুষ এভাবে কথা বলতে পারেন!
সবাই জানে, গাড়ির অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দেশে নব্বই ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত চালকদের উপযুক্ত বিচার হয় না। বিচারে কখনো শাস্তি হলেও, তা কার্যকর করা যায় না। কোনো চালকের শাস্তি হলেই পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়। রাজনৈতিক পান্ডারা তাতে মদত জোগায়। আর সরকারকে পিছু হটে আপস করতে হয়। যার ক্ষতি হয়, সেটা শুধু তাকেই বইতে হয়। যে পরিবার স্বজন হারায়, সে শূন্যতার হাহাকার শুধু তাদেরই পোড়ায় চিরকাল।
সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। নতুন বাজার থেকে প্রগতি সরণির প্রশস্ত রাস্তা শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত লোকজনের চলাফেরা যথেষ্ট কম। আমার পায়ে স্লিপার। আমি বরাবরই গাড়ি ছাড়া বের হলে স্লিপার পরে বের হই। ফলে হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে না। প্রগতি সরণির রাস্তা বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দখলে। রাস্তার কোণায় দাঁড়িয়ে আমি পুরো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। দুর্ঘটনার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নেয়। এমনকি রেলওয়ে স্টেশন অবরোধ করে।
অসংখ্য ছাত্রছাত্রী পুরো রাস্তা দখলে রেখেছে। সেই তুলনায় পুলিশের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ছে না। শিক্ষার্থীদের ভিতর কোনো মারমুখী মনোভাব লক্ষ্য করছি না। কিন্তু আমাকে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না, পাসপোর্ট ডেলিভারি নিতে হবে। হঠাৎ মনে পড়ল আমার এক সিনিয়র বন্ধুর কথা। পনেরো সালের প্রথম দিকে হরতালের সময় যখন বাস এবং প্রাইভেট গাড়িতে পেট্রলবোমা ছোড়া হচ্ছিল, তিনি আমাকে বলেছিলেন, রাস্তায় বের হলে যেন চারদিকে খুব খেয়াল করে চলি। পুরো পরিবেশ এবং পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ এখানে যদি পুলিশ অথবা হেলমেট বাহিনী আসে এবং অপতৎপরতা চালায়, তবে কী করব-সেটিও ভাবছি।
শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নানা স্লোগান লিখে রেখেছে। তারা যেসব প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-তাতে নানা দাবির কথা লেখা আছে। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ লিখে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছে-সেই নিউজের লিঙ্ক ব্যবহার করে আমি গতকাল বিকালে ফেসবুকে একটি স্টেটাস দিয়েছি। তাতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘আলোর পাখিরা’ বলে সম্বোধন করে কিছু কথা লিখেছি।
আশপাশের অলিগলিতে লোকজন চলাফেরা করছে। মুদি এবং মনোহরি দোকানে কেনাকাটা চলছে। মিষ্টির দোকানও খোলা। ছাত্রছাত্রীদের এ আন্দোলন সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছে। আমি আমার জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হইনি। কথায় আছে, ‘একা না বোকা’। আমার অবস্থা অনেকটা তাই। ভিতরে ভিতরে আমি ভীষণ আতঙ্কে আছি। যে কোনো সময় এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। চোখের পলকে দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হতে পারে। পুলিশ ছেলেমেয়েদের ওপর লাঠিচার্জ করতে পারে। হেলমেট বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করতে পারে-যেটা এর আগে নানা স্থানে হয়েছে। পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছুড়তে পারে, ফাঁকা গুলি করতে পারে। যদি তাই হয়, তবে আমি ঝট করে কোনো গলিতে ঢুকে পড়ব। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
শিক্ষার্থীদের হাতে বাঁশের ফালি এবং লম্বা কাঠ দেখতে পেলাম। একটি মর্মান্তিক ঘটনায় কিশোর-কিশোরীরা হঠাৎ কীভাবে এত বড় হয়ে গেল! ভাবতে অবাক লাগে। তারা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়েছে। রিকশা, বাস, প্রাইভেট গাড়ি এবং অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আলাদা আলাদা লেন তৈরি করেছে। ড্রাইভারের লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস আছে কিনা পরীক্ষা করছে। লাইসেন্স না থাকায় এবং ট্রাফিক আইন ভেঙে উল্টোপথে চলার কারণে মন্ত্রী কিংবা ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি পর্যন্ত আটকে দিচ্ছে। ফিরিয়ে দিচ্ছে। দেশের ইতিহাসে এমন অভূতপূর্ব ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
শিক্ষার্থীরা নির্ভীক চিত্তে তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট দলে মিছিল করছে। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা- ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’। ‘রাস্তা বন্ধ/রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’। ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ/যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ’ ইত্যাদি।
যমুনা ফিউচার পার্কে আজই প্রথম এলাম। পাসপোর্ট কালেক্ট করে আবার একই পথে পায়ে হেঁটে নতুন বাজার পৌঁছলাম। কৈশোর এবং তারুণ্যের বিক্ষোভের বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করে মনে আশার আলো জাগল। একবার যখন জেগেছে পাখিরা, এই জাগরণ বহমান থাকবেই। এর মধ্যে সেলফোনে প্রচুর কল এসেছে। বিশেষ করে পুত্রের পিতা অসংখ্যবার কল করেছেন। তিনি বাড়িতে আছেন। তিনি কদিন কিছুটা অসুস্থ। আমি বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আমি পাসপোর্ট কালেক্ট করার ফাঁকে শুধু ড্রাইভারকে একটি কল করে নতুন বাজার আসতে বলেছি। সন্ধ্যায় সিএনজি করে এতটা পথ একা যাওয়ার সাহস হলো না। আবার বাড়ি ফেরার তাড়াও রয়েছে। মূলত আমি ঘণ্টাখানেকের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে বেরিয়েছিলাম। সেখানে চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
এখন রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। বাসায় পৌঁছতে খুব একটা সময় লাগল না। ঘরে ঢুকে দেখি ছেলে জগের পানি মেঝেতে ঢেলেছে। ওর কাপড়-চোপড় সব ভেজা। পুরো বাড়িতে চাল আর আলু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সে কাঁচা আলু চিবিয়ে খাচ্ছে। আমি বাসায় ঢুকতেই বলল, আম্মু, আম্মু-
‘যদি তুমি ভোয় পাও, তবে তুমি শেত
যদি তুমি লুথে দালাও, তবে তুমি বাংলাদেশ’।