বুদ্ধিজীবী শব্দটা আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। সাধারণত বড় লেখক, চিন্তক বা ভাবুকদের সমাজ বুদ্ধিজীবী বলে আখ্যায়িত করে থাকে। যারা দৈহিক শ্রমের বদলে মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দেন তারাই বুদ্ধিজীবী। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে : বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, সব পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী।
ইতালির বামপন্থি বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, সাংবাদিক আন্তোনিয়ো গ্রামশি তাঁর কারা জীবনের নোটবইতে লিখেছিলেন- ‘সব মানুষই বুদ্ধিজীবী, কিন্তু সমাজে সবার ভূমিকা বুদ্ধিজীবী নয়।’
দার্শনিক অ্যাডওয়ার্ড সাঈদের মতে- বুদ্ধিজীবী এমন একজন ব্যক্তি যিনি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে একটি নির্দিষ্ট বার্তা, একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও একটি সুচিন্তিত মতামত জনগণের সামনে তুলে ধরেন। কোনো প্রতিবন্ধকতাই তাকে সত্য প্রকাশ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’তে সংস্কৃতির দৈন্যদশা বর্ণনা করতে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বুদ্ধিজীবীদের বেশির ভাগই মানুষের প্রতি তাদের মর্যাদাবোধের পরিচয় দেন না। যে শ্রমজীবী মানুষ ‘ইতিহাসের নির্মাতা’ তাদের জীবনযাপনকে ‘তত্ত্ব’ দিয়ে নয়, তাদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে জীবনের গভীর সত্যকে অনুসন্ধান না করলে বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর দায় সুসম্পন্ন হয় না’।
অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা জীবন সত্যি দিয়ে বিচার না করে বিচার করেন তত্ত্ব দিয়ে। কিন্তু এ কথা তো নির্মম সত্য, তত্ত্ব দিয়ে জীবন চলে না। শ্রমজীবীর পেট ভরে না। তাই বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে এমন অনেক প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
অনেকে বলেন, বুদ্ধিজীবীরা শুধু সমালোচনামূলক চিন্তা করেন না, তারা আদর্শিক সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব করেন। তারা অন্যায়ের নিন্দা আর প্রতিবাদ করেন। অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করে নতুন কোনো প্রস্তাব দেন। মূল্যবোধের সংকট থেকে সমাজকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। বাস্তবে কি সেটা হয়, সে এক কঠিন প্রশ্ন।
বুদ্ধিজীবী শব্দটা একদিনে আসেনি। ফরাসি শব্দ বেলেট্রিস্ট বা ম্যান অব লেটারসের বাংলা ‘অক্ষরের মানুষ’। অক্ষরের মানুষরা ছিলেন সাক্ষর, পড়তে-লিখতে পারতেন। তারা এমন সময়ে সাক্ষর ছিলেন যখন সমাজে সাক্ষরতা বিরল ছিল। উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে এদের জানাশোনা ছিল। ১৭ এবং ১৮ শতকে প্রথম বেলেট্রিস্ট শব্দটি সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
১৯ শতকের শেষে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে সাক্ষরতা তুলনামূলকভাবে বেড়েছিল, তখন ‘ম্যান অব লেটারস’ শব্দটিকে ‘বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যিনি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে লেখালেখি করে জীবিকা অর্জন করেন তিনিই ম্যান অব লেটারস। প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, সমালোচক এবং অন্যরা এর মধ্যে পড়েন। স্যামুয়েল জনসন, ওয়াল্টার স্কট এবং টমাস কার্লাইলও এ দলভুক্ত। ২০ শতকে ‘ম্যান অব লেটারস’ শব্দটি বাতিল হয়ে যায়। এর পর থেকে চালু হয় ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি। বুদ্ধিজীবী শব্দটি ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ মহাভারতে দ্রৌপদীর স্বয়ংম্বর সভায় পাওয়া যায়। বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত সমাজের শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি থেকে আসেন।
অতীতে এদেশের বুদ্ধিজীবীরা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাই রেখেছিলেন। দেশ বিভাগের পর থেকে ভাষার প্রশ্নে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাতে প্রধান ভূমিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাখলেও, বুদ্ধিজীবীরা চুপ করে থাকেননি। ছাত্রদের ওপর গুলি হলে তারা প্রতিবাদ করেছিলেন, কয়েকজন শিক্ষক জেলও খেটেছিলেন। তাদের সমর্থন ও পরামর্শ প্রতিটি পদে পেয়েছিল ছাত্ররা।
তৎকালীন অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সাধারণ মানুষের চেতনায় নাড়া দিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেত এটা সবাই জানলেও অর্থনীতিবিদরা সেটা স্পষ্টতর করে তুলেছিলেন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে তারা বলা এবং লেখায় ক্রমাগত দেখাচ্ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রে ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়েছে। সরকার সঠিক তথ্য দিত না। গোপন রাখত। কেন্দ্রীয় অর্থ দপ্তরের উচ্চপদে বাঙালিদের নিয়োগ করা হতো না। এতরকম গোপনীয়তার পরও অর্থনীতিবিদরা দুটি স্বতন্ত্র অর্থনীতি চালু করা প্রয়োজন এটা বুঝেছিলেন। দুই অঞ্চলের অর্থনীতিকদের মধ্যে মতবিরোধ প্রবল হয়ে উঠেছিল। তারা মাঝেমধ্যেই একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট প্রদান করত। আইয়ুব খান ধমক দিয়ে, অস্ত্রের মুখে এ দাবি স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বরং দুই অর্থনীতি নয়, দুই স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইংরেজরা চায়নি এ এলাকার মানুষ শিক্ষিত হোক, লেখাপড়া শিখুক, পাকিস্তানিরাও তা চায়নি। এদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি সৃষ্টির জন্য; বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর ছিল কিছু দুর্বলচিত্ত ও লোভী মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু পাকিস্তানপন্থি ছিলেন। সরকারের সমর্থন ও সহায়তা ছিল তাদের পেছনে। কিন্তু তারা দেশের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি বিপুলসংখ্যক মুক্তিকামী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কারণে। পাকিস্তানিরা কখনো চায়নি শহরের মধ্যে ভালো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হোক। যাতে ছাত্ররা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে না পারে, লেখাপড়ায় নিরুৎসাহিত হয় সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি করা হয় শহর থেকে অনেক দূরে দূরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢাকা থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে বারবার। বিশ্ববিদ্যালয় শহরের মাঝখানে থাকলে ছাত্র ও শিক্ষকরা তাদের অধিকারের কথা বলবে, রাজনীতি করবে, মিটিং মিছিল করবে।
ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনেও বুদ্ধিজীবীরা পক্ষে ছিলেন। ঢাকায় শহীদ আসাদুজ্জামান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোহাকে গুলি করার সংবাদ প্রচার হওয়া মাত্র কার্ফু অগ্রাহ্য করে হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়েছিল রাস্তায়। বুদ্ধিজীবী সমাজের বড় অংশ ছিল তাদের পাশে। শিক্ষকরা মিছিল করেছিলেন। ঊনসত্তরের আন্দোলনে পাকিস্তান সরকার যা বর্জন করেছে জনগণ তাই জড়িয়ে ধরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পাকিস্তানিদের রাগ ছিল মারাত্মক। তাই গণহত্যার শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের গুলি করল নির্বিচারে। আরেকবার মরণ কামড় দিল আত্মসমর্পণের আগে ১৪ ডিসেম্বর। বেছে বেছে হত্যা করল বুদ্ধিজীবীদের। শুধু শিক্ষকদের নয় বা ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল না বুদ্ধিজীবী নিধন, সারা দেশের বুদ্ধিজীবীরা ছিল তাদের টার্গেট। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধরে দেশব্যাপী তারা বুদ্ধিজীবী হত্যা করল।
২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সঙ্গেই বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। তাদের সহযোগিতা করেছে পাকিস্তানি হানাদারদের এদেশীয় বশংবদরা। তারা বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের চিনিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানিরা সবাইকে চিনত না।
আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পরেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তার সহযোগীদের গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখ স্বনামধন্য চলচ্চিত্রনির্মাতা জহির রায়হান রাজধানীর মিরপুর থেকে নিখোঁজ হন। এ রহস্য আজও অনুদঘাটিত।
বাংলা পিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা :
শিক্ষাবিদ-৯৯১, সাংবাদিক-১৩, চিকিৎসক-৪৯, আইনজীবী-৪২, অন্যান্য (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী) ১৬। আমার জানা মতে, বেশ কয়েকজন আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালে।
জুলাইয়ের আন্দোলন ছাত্ররা শুরু করেছিল। ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল সারা দেশের মানুষ। এ আন্দোলনে বেশ কয়েকজন শিক্ষক প্রত্যক্ষভাবে ছাত্রদের পক্ষে ছিলেন, তাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন। মিটিং-মিছিল করেছেন তারা। ছাত্রদের গ্রেপ্তার করে ডিবি অফিসে নিয়ে গেলে কয়েকজন শিক্ষক তাদের ছাড়িয়ে আনতে সেখানে গিয়েছিলেন। রাজনীতিবিদ সোহেল তাজ ডিবি অফিসে গিয়েছিলেন ছাত্রদের খোঁজখবর নিতে। তবে এদেশের নামকরা বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন নিশ্চুপ। ছাত্ররা যখন পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছিলেন তাদের অনেকেই কোনো কথা বলেননি। বেশকিছু বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্রকর্মী আন্দোলনবিরোধী একটা মোর্চাও গড়ে তুলেছিলেন।
বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ সব সময়ই সরকারের তল্পি বয়েছেন। তারা ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিলেন, রবীন্দ্রবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন, আটষট্টি সালে অগ্রগতির ১০ বছরের গুণকীর্তন করে লিখেছেন- ’৬৬, ’৬৯, ’৭১ সব সময়ই নিজেদের আখেরের চিন্তা করেছেন আর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। পুরস্কার, পদপদবি, তকমা, বিদেশ, ভ্রমণ অর্থের লোভে তারা যতই সরকারের কাছে ভিড়েছেন জনগণ ততই তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
এ দেশের সব আন্দোলনের সূত্রপাত করেছে ছাত্ররা। বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলনের নেতৃত্বে কখনোই ছিলেন না। তবে অনেকেই সঙ্গে ছিলেন। ঊনসত্তর এবং একাত্তরের আন্দোলনের সময় শিক্ষকরা রাজপথে শোভাযাত্রা করেছেন। বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে সমাজ অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। প্রত্যাশা তারা আদর্শবান হবেন, কোনো আদর্শিক সংকট দেখা দিলে সমাধানের চেষ্টা করবেন, প্রতিক্রিয়া জানাবেন। নিরপেক্ষ সমালোচনা করবেন। সত্যের পক্ষে কথা বলবেন। পেশা ও ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে সমস্যা এড়িয়ে যাবেন না। বৈশ্বিক সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। কে ভালো বলল, কে মন্দ এসব ভাববেন না। প্রয়োজনে একা হবেন, বিচ্ছিন্ন হবেন।
আমরা চাই বুদ্ধিজীবীরা কখনো সরকারের ঘরের লোক হবেন না, জি হুজুর, জি হুজুর করবেন না, ঝাঁকের কই হবেন না, তারা চলবেন স্রোতের বিপরীতে, সত্যের পক্ষে। সক্রেটিস থেকে সলজেনিৎসিন, অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ থেকে নোয়াম চমস্কি সেটাই ছিলেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র প্যারিসের রাস্তায় নিষিদ্ধ কাগজ ফেরি করে গ্রেপ্তার হয়েছেন, ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন নোবেল পুরস্কার (১৯৬৫) ও লেজিওঁ দ্য অনার, আলজেরিয়া ও ভিয়েতনামের জন্য পথে নেমেছেন। বুদ্ধিজীবীর নিরপেক্ষতা ও সোচ্চারতা গণতন্ত্রের জন্যও জরুরি। গণতন্ত্রে বিরোধী স্বরের উপস্থিতি দরকার। সেই স্বর গড়ে তুলতে পারেন বুদ্ধিজীবীরা।